বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে শুরু হয়েছে অসন্তোষ, বিদ্রোহ এবং দলবদলের জল্পনা। সই জালিয়াতি বিতর্কে যখন রাজ্য রাজনীতি উত্তাল, ঠিক সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করে দলের অন্দরের অস্বস্তিকে আরও উসকে দিলেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্যের বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি দলের একাংশের ভূমিকা এবং একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে কুণাল স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতীকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। ভোটের অল্প সময়ের মধ্যেই যারা ব্যক্তিগত স্বার্থে বা প্রতিপক্ষের মদতে দলনেত্রীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, তাঁদের অবস্থান তিনি সমর্থন করেন না বলেও জানিয়েছেন।
তবে শুধুমাত্র আনুগত্যের বার্তাতেই থেমে থাকেননি কুণাল। দলের অভ্যন্তরে ভুল সিদ্ধান্ত বা সাংগঠনিক ত্রুটি নিয়ে তাঁর ক্ষোভও প্রকাশ পেয়েছে পোস্টে। তিনি লিখেছেন, ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার পরিবর্তে যদি একই ধরনের সিদ্ধান্ত বারবার চলতে থাকে, তাহলে তা দেখে নীরব থাকা সম্ভব নয়। বিভিন্ন জেলা থেকে কর্মী, ছাত্র ও যুব সংগঠনের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
কুণালের বক্তব্য, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং অভিযোগ তিনি শুনছেন, শুনবেনও। তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকলেও ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার পাশে তিনি নেই।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, কুণালের এই পোস্টের নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের সাম্প্রতিক সাংগঠনিক রদবদল। নতুন কমিটিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকলেও তাঁর সঙ্গে ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে দলের অন্দরে যে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, কুণালের পোস্ট সেই বিতর্ককেই নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও কুণাল ঘোষকে বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দেখা গিয়েছে। ওয়াই-চ্যানেলের ধর্নামঞ্চে তাঁর উপস্থিতি যেমন নজর কেড়েছিল, তেমনই পরদিন প্রশাসনিক বৈঠকে অংশ নেওয়াও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুণালের এই বার্তা দ্বিমুখী। একদিকে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি নিজের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন, অন্যদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কার্যকলাপ নিয়ে প্রকাশ্যে মত প্রকাশের অধিকারও বজায় রেখেছেন।
সব মিলিয়ে, তৃণমূলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কুণাল ঘোষের এই পোস্ট নতুন করে দলীয় অন্দরের সমীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আগামী দিনে এই অসন্তোষ শুধুই মতামতের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সাংগঠনিক স্তরে তার প্রভাব পড়ে— সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।




