টানা ২৪ দিনের আন্দোলনের চাপে বড় সিদ্ধান্ত নিল ঝাড়খণ্ডের হেমন্ত সোরেন (Hemant Soren) সরকার। নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের অন্যতম প্রধান দাবি মেনে ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (JSSC-CGL) পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১৪ সাল থেকে টিএসআর ডেটা প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেড (TDPL)-এর মাধ্যমে নেওয়া সমস্ত পরীক্ষা, তাদের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগও বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সোমবার, ১৭ অগস্ট, মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন জানান, মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, TDPL-এর মাধ্যমে পরিচালিত পরীক্ষাগুলির ক্ষেত্রে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। ২০১৪ সাল থেকে সংস্থাটির মাধ্যমে হওয়া পরীক্ষাগুলিতে কোনও অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করবে ঝাড়খণ্ড পুলিশের CID। পাশাপাশি নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে পৃথক কমিটিও গঠন করা হবে।
এই ঘোষণার আগে প্রায় সাড়ে তিন সপ্তাহ ধরে রাঁচিতে আন্দোলন চলছিল। JPSC-JSSC Reform Manch-এর ব্যানারে চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সরব হন। রাজধানী রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়াম চত্বরেও লাগাতার অবস্থান-বিক্ষোভ চলেছে। আন্দোলনের একাধিক পর্যায়ে অনশনও শুরু করেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ দেবেন্দ্র নাথ মাহতো (Devendra Nath Mahato) টানা ১৬ দিন অনশন করেছিলেন। সরকারের পরীক্ষাবাতিলের ঘোষণার পর তিনি অনশন প্রত্যাহার করেন। মন্ত্রী দীপিকা পাণ্ডে সিং এবং ইরফান আনসারির উপস্থিতিতে তাঁর অনশন ভাঙার খবরও সামনে এসেছে। মাহতোর বক্তব্য, JSSC-CGL বাতিলের সিদ্ধান্ত ছাত্র আন্দোলনের বড় জয়।
তবে সরকারের সিদ্ধান্তে আন্দোলনের সব দাবি পূরণ হয়নি। ছাত্রদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল নিয়োগ পরীক্ষার অভিযোগের তদন্ত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI-এর হাতে তুলে দেওয়া। সেই দাবি এখনও মানা হয়নি। ফলে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও CBI তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন পুরোপুরি শেষ হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এর আগে আন্দোলনকারীরা সরকারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি মেনে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। দাবি পূরণ না হলে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচির কথাও জানিয়েছিল JPSC-JSSC Reform Manch। ১৬ অগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ছিল বিতর্কিত নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি CBI তদন্ত এবং নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
এ দিকে সরকারের পরীক্ষাবাতিলের সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন জটিলতাও তৈরি হয়েছে। JSSC-CGL-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যেই যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের একাংশ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা শুরু করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, পরীক্ষায় তাঁরা নিজেদের যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছেন; ফলে পুরো পরীক্ষা বাতিল হলে তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। অর্থাৎ, একদিকে আন্দোলনকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে, অন্যদিকে ইতিমধ্যে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যেও নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সরকারের ঘোষণার ফলে এখন তদন্তের দিকেই নজর থাকবে। ২০১৪ সাল থেকে TDPL-এর মাধ্যমে হওয়া পরীক্ষাগুলিতে কোনও অনিয়ম, গাফিলতি বা অন্য কোনও বেআইনি কার্যকলাপ হয়েছিল কি না, CID-এর তদন্তে তার উত্তর মিলবে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটির রিপোর্টও নিয়োগ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, ঝাড়খণ্ডের ছাত্র আন্দোলনের চাপে JSSC-CGL এবং TDPL-এর মাধ্যমে হওয়া নিয়োগ পরীক্ষাগুলি বাতিলের সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ। আন্দোলনকারীদের একটি বড় দাবি পূরণ হলেও CBI তদন্তের প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত। ফলে আপাতত আন্দোলনের তীব্রতা কমলেও ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ পরীক্ষা বিতর্ক পুরোপুরি মিটল না—আগামী দিনে CID তদন্ত, বিচারপতি-নেতৃত্বাধীন কমিটির কাজ এবং CBI নিয়ে সরকারের অবস্থানই ঠিক করবে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।



