দুই সন্তানের পর পরিবার পরিকল্পনায় আরও জোর দেওয়ার বার্তা দিল পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যদপ্তর। প্রসূতি মৃত্যু নিয়ে স্বাস্থ্যভবনে সাম্প্রতিক পর্যালোচনা বৈঠকে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণ এবং একাধিক সন্তানের জন্ম দেওয়ার মতো বিষয়গুলি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখার্জি (Dr. Sharadwat Mukherjee) জানিয়েছেন, ১৩তম এমনকি ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনাও রাজ্যের কয়েকটি জেলা থেকে সামনে এসেছে। তবে দুইয়ের বেশি সন্তান নেওয়া নিষিদ্ধ করে নতুন আইন আনার বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি আইন বা নির্দিষ্ট খসড়া ঘোষণা করা হয়নি—স্বাস্থ্যদপ্তরের পক্ষ থেকে মূলত পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভনিরোধক ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যভবনের বৈঠকে প্রসূতি মৃত্যুর কারণগুলি খতিয়ে দেখতে গিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক বয়সে গর্ভধারণের বিষয়টি বিশেষ ভাবে উঠে আসে। পাশাপাশি, বারবার গর্ভধারণ ও একাধিক সন্তানের জন্মের ক্ষেত্রেও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আলোচনা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বার্তা, দুটি সন্তান হয়ে গেলে স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভনিরোধক পরিষেবা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, এই মুহূর্তে জোর দেওয়া হচ্ছে সচেতনতা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পরিবার পরিকল্পনার উপর।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের গর্ভধারণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নাবালিকা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ জেলার সুতি-১, সুতি-২ এবং শমশেরগঞ্জের মতো এলাকায় এই সমস্যা বেশি বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের ক্ষেত্রে কিশোরী ও মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে দ্রুত চিকিৎসা এবং সচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ‘হাম দো হামারে দো’ নীতির মতো দুইয়ের বেশি সন্তান নিলে শাস্তি হবে বা নতুন আইন করে সন্তানসংখ্যা বেঁধে দেওয়া হবে, এমন কোনও নির্দিষ্ট সরকারি আইন ঘোষণার তথ্য এখনও সামনে আসেনি। ফলে স্বাস্থ্যদপ্তরের পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত বক্তব্যকে সরাসরি ‘দুই সন্তানের আইন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
প্রসূতি স্বাস্থ্য নিয়ে রাজ্যের বর্তমান পরিসংখ্যানেও উন্নতির ছবি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ২০২৬-২৭ সালের বাজেট নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজ্যের মাতৃমৃত্যুর অনুপাত প্রতি এক লক্ষ জীবিত জন্মে ১০৪-এ নেমেছে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ২০২৫-২৬ সালে ৯৯.৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যানেই অবশ্য দেখা যাচ্ছে, পরিবার পরিকল্পনার প্রয়োজন এখনও যথেষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের ২০২২ সালের জন্ম-মৃত্যু সংক্রান্ত সরকারি রিপোর্টে ৬ বা তার বেশি জন্মক্রমের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, একাধিক সন্তানের জন্মের প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং মাতৃস্বাস্থ্যের সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনার সম্পর্ক নিয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসনের নজর রয়েছে।
স্বাস্থ্যদপ্তরের ১০০ দিন পূর্তির কর্মসূচিতে শুধু প্রসূতি স্বাস্থ্য নয়, চিকিৎসা পরিকাঠামো নিয়েও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। কলকাতায় নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ তৈরির পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলিতে আয়ুর্বেদিক আউটডোর পরিষেবা চালুর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এর ফলে অ্যালোপ্যাথি হাসপাতালেও রোগীরা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বেসরকারি হাসপাতালের পরিষেবাকেও সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। সরকারি হাসপাতালে বেড না থাকলে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা রোগীদের নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়ে মকড্রিলও করা হয়েছে। এসএসকেএম হাসপাতাল (SSKM Hospital) থেকে কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে রোগী স্থানান্তরের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থার মহড়া হয়।
সব মিলিয়ে, রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরের সাম্প্রতিক বার্তার কেন্দ্রে রয়েছে প্রসূতি মৃত্যু কমানো, অপ্রাপ্তবয়স্কদের গর্ভধারণ রোখা এবং পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবাকে আরও কার্যকর করা। দুই সন্তানের পর পরিবার পরিকল্পনার পরামর্শ দেওয়া হলেও, এই মুহূর্তে ‘দুইয়ের বেশি সন্তান নিষিদ্ধ’ করে কোনও নতুন আইন চালুর সরকারি ঘোষণা হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জল্পনার বদলে স্বাস্থ্যদপ্তরের আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা বা ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের দিকেই নজর রাখা জরুরি।



