বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে দ্রুত বদলাচ্ছে চাল। আর সেই বদলের মধ্যেই সামনে আসছে এক নতুন ও সম্ভাব্য শক্তিশালী সামরিক অক্ষের ছবি—যা ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক—এই তিন মুসলিম-প্রধান দেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি নীরবে জন্ম নিচ্ছে এক ‘ইসলামি ন্যাটো’?
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Bloomberg-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে Turkey। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে আমূল পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে মত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
২০২৫ সালে পাকিস্তান ও Saudi Arabia-র মধ্যে হওয়া ওই চুক্তির মূল শর্ত ছিল—এক দেশের উপর হামলা হলে তা অন্য দেশের উপর হামলা হিসেবেই বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, পারস্পরিক সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা। একই শর্তে তুরস্ক যুক্ত হলে, সেটি কার্যত একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বলয়ে পরিণত হবে।
শক্তির ত্রয়ী জোট: ‘ইসলামি ন্যাটো’ কি বাস্তবের পথে?
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিন দেশের ক্ষমতা একত্রিত হলে তা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক অক্ষ তৈরি করতে পারে। তুরস্কের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক TEPAV-এর বিশ্লেষক নিহাত আলি ওজ়কানের ব্যাখ্যায় এই জোটের ভূমিকা স্পষ্ট—
-
তুরস্ক: অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ড্রোন ব্যবস্থা এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী।
-
Pakistan: ইসলামি বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ, সঙ্গে ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা।
-
সৌদি আরব: বিপুল ‘পেট্রো-ডলার’, যা অস্ত্র কেনা ও সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা নেয়।
এই ত্রিমুখী শক্তির সমন্বয় অনেকটাই আমেরিকার নেতৃত্বাধীন NATO-র আদলে একটি বিকল্প সামরিক জোটের রূপরেখা তৈরি করতে পারে—যাকে অনেকে ‘ইসলামি ন্যাটো’ বলেই আখ্যা দিচ্ছেন।
আসল ন্যাটো নিয়েও প্রশ্ন
উল্লেখযোগ্য ভাবে, তুরস্ক নিজেই ন্যাটোর সদস্য। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর আমেরিকার অবস্থান ঘিরে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ইজ়রায়েল-কেন্দ্রিক কূটনীতি ও ন্যাটোতে মার্কিন আর্থিক অনুদান কমানোর প্রবণতায় তুরস্ক বিকল্প নিরাপত্তা বলয় খুঁজছে বলেই মনে করছেন সামরিক পর্যবেক্ষকেরা।
কেন ভারতের জন্য বড় উদ্বেগ
এই সম্ভাব্য জোট ভারতের কাছে বিশেষভাবে চিন্তার। কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্ক বরাবরই পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের ‘মিনি-যুদ্ধ’-এ সরাসরি পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল আঙ্কারা—এমনটাই দাবি ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের। ওই সংঘর্ষে পাকিস্তান ব্যবহার করেছিল তুরস্কে তৈরি Bayraktar TB2 ড্রোন।
সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হলেও, এই ত্রিদেশীয় অক্ষ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে জটিল করে তুলতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
পশ্চিম ও মধ্যপ্রাচ্যেও অস্বস্তি
এই অক্ষ শুধু ভারত নয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং পশ্চিমী শক্তিগুলির কাছেও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। যদিও শিয়া-প্রধান ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার পথেই হাঁটতে চাইছে সুন্নি-প্রধান সৌদি আরব ও তুরস্ক।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দোহায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ-এর সফরের সময় স্বাক্ষরিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’-এ প্রয়োজনে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানের পরমাণু ছাতা ব্যবহারের মতো শর্ত রয়েছে বলেও দাবি একাংশের সামরিক বিশ্লেষকদের।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই—এই জোট কি শুধুই আত্মরক্ষার প্রয়াস, নাকি ভবিষ্যতের বৃহত্তর সংঘাতের প্রস্তুতি? উত্তর খুঁজছে গোটা বিশ্ব, সতর্ক নজরে ভারতও।



