চিনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে কৌশলগত খনিজ উৎপাদনে আত্মনির্ভর হওয়ার পথে বড়সড় পদক্ষেপ নিল ভারত। নবমবার কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ ঘোষণা করলেন, দেশে তৈরি হবে রেয়ার আর্থ করিডর, যার মাধ্যমে বিরল খনিজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও গবেষণায় এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে। তামিলনাড়ু, কেরল, ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশ—এই চার রাজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে এই করিডর, যা চিনের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাজেট বক্তৃতায় নির্মলা সীতারমণ বলেন, “বিরল খনিজ প্রকল্পটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে চালু হয়েছিল। এবার খনিজ সমৃদ্ধ রাজ্য—ওড়িশা, কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুতে খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ, গবেষণা ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে রেয়ার আর্থ করিডর স্থাপনের প্রস্তাব দিচ্ছি।” তাঁর এই ঘোষণায় স্পষ্ট, শুধু খনি থেকে খনিজ তোলা নয়, পুরো ভ্যালু চেন গড়ে তুলতেই চাইছে কেন্দ্র।


প্রসঙ্গত, গত বছরের নভেম্বরেই ৭,২০০ কোটি টাকার বিরল খনিজ প্রকল্পে ছাড়পত্র দিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। তখনই ইঙ্গিত মিলেছিল, চিন থেকে রেয়ার আর্থ আমদানির উপর ভারতের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে চাইছে দিল্লি। এবারের বাজেট ঘোষণায় সেই লক্ষ্য আরও স্পষ্ট রূপরেখা পেল।
রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ আসলে ১৭টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর সমষ্টি, যা আধুনিক প্রযুক্তির মেরুদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক যান, উইন্ড টারবাইন, সৌর শক্তি, উচ্চক্ষমতার ম্যাগনেট, এমনকি যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম—সব ক্ষেত্রেই এই খনিজ অপরিহার্য। বিশেষ করে রেয়ার আর্থ পার্মানেন্ট ম্যাগনেট ইভি ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি খাতে বিপ্লব এনেছে।
এই শিল্পে দীর্ঘদিন ধরেই একচেটিয়া আধিপত্য করে আসছে চিন। বৈশ্বিক খনি উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং পরিশোধিত ও প্রক্রিয়াজাত বিরল খনিজ উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে বেজিং। ফলে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময়ে এই খনিজ কার্যত চিনের কৌশলগত ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।


ভারতের নতুন রেয়ার আর্থ করিডর পরিকল্পনা সেই শক্তিকে ভোঁতা করার দিকেই এগোচ্ছে। খনিজ উত্তোলন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ ও গবেষণায় দেশীয় সক্ষমতা বাড়লে, একদিকে যেমন কৌশলগত নিরাপত্তা জোরদার হবে, তেমনই বৈদ্যুতিক যান ও সবুজ শক্তি খাতে দেশীয় শিল্প নতুন গতি পাবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ টানার ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প ‘গেমচেঞ্জার’ হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ।
সব মিলিয়ে, নির্মলার বাজেটে ঘোষিত রেয়ার আর্থ করিডর শুধু একটি শিল্পনীতি নয়—এটি ভারতের কৌশলগত আত্মনির্ভরতার পথে এক সাহসী ঘোষণা।







