বিশ্বজুড়ে শুল্কযুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের টালমাটাল পরিস্থিতি আর মার্কিন বাণিজ্য আগ্রাসনের আবহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও এক বড় সাফল্য। এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারতের সামনে খুলে যাবে প্রায় ১৯০ কোটি ভোক্তার বাজার, যেখানে রফতানি, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
এই চুক্তির ফলে ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য ২৭টি ইউরোপীয় দেশে শুল্কছাড়ে রফতানি করা যাবে। টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী, অটো পার্টস—এই সব ক্ষেত্রেই ভারতীয় পণ্য ইউরোপের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। দীর্ঘদিন ধরে যেখানে চিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি এগিয়ে ছিল, সেখানে ভারত প্রথমবার সমান শর্তে লড়াইয়ের সুযোগ পাবে।

শুধু রফতানি নয়, এই চুক্তি ভারতের উৎপাদন ক্ষেত্রেও গতি আনবে। ইউরোপীয় সংস্থাগুলির ভারতে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও পিএলআই প্রকল্পকে আরও শক্তিশালী করবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে আগামী কয়েক বছরে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে—বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং ও তার সঙ্গে যুক্ত শিল্পে।
একই সঙ্গে এই চুক্তি ভারতের জন্য খুলে দিচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি ও সবুজ শক্তির দরজা। ক্লিন এনার্জি, গ্রিন হাইড্রোজেন, ইলেকট্রিক ভেহিকল ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে ইউরোপ অনেক এগিয়ে। এই সহযোগিতার মাধ্যমে ভারতের জ্বালানি রূপান্তর ও শিল্প আধুনিকীকরণ আরও দ্রুত এগোতে পারে।
কৌশলগত দিক থেকে দেখলে, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য এক ধরনের ‘স্ট্র্যাটেজিক ইন্স্যুরেন্স’। আমেরিকা ও চিন—এই দুই বৃহৎ অর্থনীতির উপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপকে বিকল্প ও স্থিতিশীল বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরাই এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য। এই কারণেই আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ একে ভারতের বাণিজ্য কূটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলির মধ্যে রাখছে।


তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইউরোপের কার্বন বর্ডার ট্যাক্স, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উপর প্রতিযোগিতার চাপ—এই বিষয়গুলি নিয়ে এখনও উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, লাভের পাল্লাই অনেক বেশি ভারী। ধাপে ধাপে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলির সমাধানের পথ খোলা থাকছে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য শুধু শুল্কছাড় নয়—এটি রফতানি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধির এক দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা। এই কারণেই একে ‘মাদার অফ অল ডিলস’ বলা হচ্ছে।








