অর্ক সানা, সম্পাদক (নজরবন্দি): একটি দেশের পতন কখনও এক দিনে ঘটে না—ঘটতে থাকে ধীরে, স্তরে স্তরে, নীরবে। আজ বাংলাদেশের সামনে ঠিক সেই সঙ্কটই দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড শুনিয়েছে, তখন দেশ শুধু রাজনৈতিক নয়—আদর্শগত ও ভৌগোলিক অস্তিত্বের সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়েছে। এই রায় কেবল একটি রাজনৈতিক পরিণতি নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথ কোন দিকে যাবে তারও নির্মম ইঙ্গিত।
হাসিনা যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বশেষ “মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক শক্তি” হন—তাহলে তাঁর পতনের পর যে শূন্যতা তৈরি হল, তা পূরণ করতে কারা এগিয়ে আসবে?
গণতান্ত্রিক শক্তি, নাকি ইসলামপন্থী মৌলবাদ? ভারত এই প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারে না।
হাসিনাকে ফাঁসি: পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতায় কি উগ্রপন্থীদের হাতে বাংলাদেশ?

শেখ হাসিনার রায়ের আগের দিন ঢাকায় ছিলেন পাকিস্তানের শক্তিশালী ইসলামি দল জামাত উলেমা-ই-ইসলাম–ফজ়ল (JUI-F)-এর প্রধান মওলানা ফজলুর রহমান—পাকিস্তান রাজনীতির “ধর্মীয় ডিপ্লোম্যাট”।
তিনি বলেছেন—
“বাংলাদেশ এক পা এগোলে পাকিস্তান দু’পা এগোবে।”
এটি শুধু সৌজন্য বক্তব্য নয়। এটি একটি সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা—বাংলাদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীর নতুন জায়গা তৈরি হচ্ছে, এবং পাকিস্তান সেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়তে প্রস্তুত।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বপ্ন ছিল—
একটি ধর্মনিরপেক্ষ, স্বাধীন, প্রগতিশীল রাষ্ট্র।
আজ সেই রাষ্ট্রই যেন ক্রমশ পিছিয়ে চলেছে ১৯৭১–এর অন্ধকারের দিকে।

হাসিনার পতনের পর কারা উঠে আসবে? গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় কাজ ছিল একটাই—
বাংলাদেশ থেকে চরমপন্থী ইসলামি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
তিনি ছিলেন সেই পাতলা দেওয়াল, যা মৌলবাদকে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে রেখেছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে— জামাত, হেফাজত ও পাকিস্তানপন্থী দলগুলি নতুন করে মাথা তুলবে। পাকিস্তানের ISI সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা ইসলামপন্থী প্রভাব বাড়তে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্ব ও বাংলাদেশ সীমান্ত আরও অস্থিতিশীল হতে পারে। এই পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক নয়—কৌশলগত এবং নিরাপত্তাজনিত সঙ্কট।
বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের পথে হাঁটছে?
গত দশকে পাকিস্তান নানা ভাবে বাংলাদেশকে ইসলামিক ব্লকের দিকে ঠেলে দিয়েছে—
১) “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার”
২) “ইসলামি ভ্রাতৃত্ব”
৩) “দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম ঐক্য”
এই শব্দবন্ধগুলির আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি গভীর সত্য—
যে বাংলাদেশ ১৯৭১–এ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, আজ সেই পাকিস্তানের মতাদর্শই ঢুকে পড়ছে সেখানে। পাকিস্তানের ‘কৌশলী ধর্মনীতির’ লক্ষ্য স্পষ্ট—ভারত–অনুকূলে থাকা বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা। হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর সেই লক্ষ্য আরও সহজ হল।

ভারতের জন্য এর অর্থ কী?
শেখ হাসিনার মেয়াদে ভারত পেয়েছিল—
১) পূর্ব ও উত্তর–পূর্ব সীমান্তে স্থিতিশীলতা
২) বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যকলাপ কমে যাওয়া
৩) সন্ত্রাস বিরোধী সমঝোতা
৪) আঞ্চলিক বাণিজ্য, জলপথ, ট্রানজিটের সুবিধা
হাসিনার পতনের পর এগুলি এখন অনিশ্চিত। যদি বাংলাদেশ পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে যায়, তাহলে—
১. উত্তর–পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। ULFA, NSCN, জিহাদি সংগঠনরা আবার বাংলাদেশে আশ্রয় পেতে পারে।
২. রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো চরমপন্থার প্রজননক্ষেত্র হতে পারে। এটি পাকিস্তানের বহুদিনের লক্ষ্য।
৩. ভারতের পূর্ব সীমান্তে ‘দ্বিতীয় পাকিস্তান’ তৈরির আশঙ্কা। এটি ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক বিপদ।
ভারতের ভুল—বাংলাদেশকে ‘স্থায়ী বন্ধু’ ভাবা। দুঃখজনক ভাবে ভারত দীর্ঘ সময় ধরে ধরে নিয়েছিল—বাংলাদেশ তার স্বাভাবিক মিত্র। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ক্রমে বদলাচ্ছে—
১) তরুণ ভোটাররা পাকিস্তানঘেঁষা দলগুলির প্রতি সহানুভূতিশীল
২) ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে
৩) হাসিনা–বিরোধী মনোভাব দিন দিন তীব্র হচ্ছে
৪) “ইসলামি পরিচয়”–কে রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে
যে বাংলাদেশ একসময় ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের পরিচায়ক ছিল, আজ সে দেশই ভারতবিরোধী চক্রের প্রবেশদ্বারে পরিণত হতে পারে।
হাসিনার মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের নয়, ভারতেরও বড় হার। এই রায় শুধু একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিচার নয়—
এটি একটি ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা।
প্রশ্নটি এখন কেবল বাংলাদেশ নিয়ে নয়—
ভারত কি পূর্ব সীমান্তে আরেকটি পাকিস্তান দেখতে চলেছে?
আর যদি তা-ই হয়, তবে উপমহাদেশের নিরাপত্তা মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে।
হাসিনার ফাঁসি বাংলাদেশের রাজনীতিকে শুধু রক্তাক্ত করবে না—
তার ছায়া ভারতের উপরও দীর্ঘ, শীতল, বিপজ্জনকভাবে পড়বে।









