মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Chief Election Commissioner Gyanesh Kumar) ইস্তফার দাবিতে দিল্লিতে টানা তৃতীয় দিন পথে নামল INDIA ব্লক। বৃহস্পতিবার কনট প্লেসে মধ্যাহ্নভোজের পর বাসে করে রাজঘাটে পৌঁছন বিরোধী সাংসদেরা। সেখানে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থলে অবস্থান ও প্রার্থনার মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নিজেদের আপত্তি তুলে ধরেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবারের কর্মসূচির আগে কনট প্লেসের Moets রেস্তরাঁয় বিরোধী সাংসদদের মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে (Mallikarjun Kharge)। পরপর দু’দিনের এই লাঞ্চ মিটিংয়ের পরেই পথে নামছে বিরোধী জোট। এ দিনের বৈঠকে আগের দিন অনুপস্থিত থাকা সমাজবাদী পার্টি, শিবসেনা-ইউবিটি এবং এনসিপি-এসপি-র প্রতিনিধিরাও যোগ দেন। ফলে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জোটের সমন্বয় ধরে রাখার বার্তাই সামনে এসেছে।
খড়্গে জানান, মধ্যাহ্নভোজের পর সমস্ত শরিক দলের সাংসদেরা একসঙ্গে রাজঘাটে যাবেন। সেখানে শান্তিপূর্ণ অবস্থান করে প্রার্থনা করবেন তাঁরা। তাঁর বক্তব্য, দেশের মানুষকে জানানো দরকার যে বিরোধীরা তাঁদের ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সেই অধিকার রক্ষার দাবিতেই এই আন্দোলন।
রাজঘাটের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) বলেন, প্রায় ৩০০ জন সাংসদ শান্তিপূর্ণ ভাবে অবস্থান করতে চেয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, প্রথম দিন নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে যেতে দেওয়া হয়নি এবং দ্বিতীয় দিন জंतर মন্তরের দিকেও মিছিল এগোতে বাধা দেওয়া হয়। প্রতিবাদকারীদের উপর পুলিশি বলপ্রয়োগ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এই অভিযোগের অবশ্য পাল্টা ব্যাখ্যা রয়েছে দিল্লি পুলিশের।
রাহুলের বক্তব্যে সরাসরি নিশানায় আসে কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi), স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah), রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Bhagwat) এবং জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সংবিধান ও ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, এই লড়াই থামবে না এবং জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না দেওয়া পর্যন্ত বিরোধীরা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। এগুলি বিরোধী নেতার রাজনৈতিক অভিযোগ; নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এই অভিযোগগুলিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ দিনের কর্মসূচিতে কংগ্রেসের পাশাপাশি একাধিক শরিক দলের নেতার উপস্থিতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা (Priyanka Gandhi Vadra)-র সঙ্গে কংগ্রেসের কে সি বেণুগোপাল, বিবেক তনখা, মণিকম টেগোর, জোথিমণি, রাজীব শুক্ল, দীপেন্দ্র হুডারাও ছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিএমের জন ব্রিটাস, সিপিআইয়ের পি সন্দোষ, সমাজবাদী পার্টির রাজীব রাই ও মহিবুল্লা-সহ অন্য বিরোধী নেতারাও লাঞ্চ ও পরবর্তী কর্মসূচিতে যোগ দেন।
হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিংহ সুখু এবং তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেবন্ত রেড্ডিও এ দিনের কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন। আগের দিন সমাজবাদী পার্টির অনুপস্থিতি নিয়ে জোটের অন্দরে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। বৃহস্পতিবার তাদের উপস্থিতি তাই বিরোধী শিবিরের ঐক্যের ছবিটিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এর আগের দু’দিনেও দিল্লির রাস্তায় একই দাবিতে মুখোমুখি হয়েছিল বিরোধী দল ও পুলিশ। মঙ্গলবার সংসদের মকরদ্বার থেকে নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে মিছিল করেছিল INDIA ব্লক। আকাশবাণী ভবনের কাছে পুলিশ মিছিল আটকে দিলে রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধী-সহ কয়েক জন সেখানে অবস্থানে বসেন। দীর্ঘ সময় পর তাঁদের আটক করে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অবশ্য ছেড়ে দেওয়া হয়।
বুধবারও একই ছবি দেখা যায়। জনপথের সাগর রত্না রেস্তরাঁয় খড়্গের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজের পর জंतर মন্তরের দিকে রওনা হন বিরোধী সাংসদেরা। উইন্ডসর প্লেসের কাছে তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। সেই কর্মসূচিতেও রাহুল, প্রিয়ঙ্কা-সহ একাধিক সাংসদকে আটক করা হয়েছিল। পরপর দু’দিনের পুলিশি বাধার পর বৃহস্পতিবার রাজঘাটকে বেছে নেয় বিরোধীরা।
এই ধারাবাহিক আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision)। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং এর ফলে ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে নিয়মমাফিক বলে দাবি করেছে এবং বিরোধীদের ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস এ দিন স্পষ্ট করে বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ফলে বুধবারের পর বৃহস্পতিবারও শুধু প্রতীকী কর্মসূচিতে থামেনি INDIA ব্লক। নির্বাচন কমিশনের দফতর থেকে জন্তর মন্তর হয়ে রাজঘাট—গত তিন দিনে প্রতিবাদের জায়গা বদলালেও বিরোধীদের মূল রাজনৈতিক দাবি একই রয়েছে।
এ দিকে রাজঘাটে জমায়েত ঘিরে দিল্লি পুলিশ আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। পুলিশের তরফে সেখানে জমায়েতের অনুমতি না থাকার কথা জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিরোধী সাংসদেরা রাজঘাটে পৌঁছে কর্মসূচি করেন। ফলে রাজনৈতিক প্রতিবাদের পাশাপাশি দিল্লির আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সঙ্গেও বিরোধীদের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে এই আন্দোলন শুধু দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কংগ্রেস এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলির তরফে দেশের বিভিন্ন জায়গাতেও কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ অক্টোবর ককক্রোচ জনতা পার্টি (CJP)-র আরও একটি বিক্ষোভের ডাক রয়েছে। ফলে SIR ও নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আগামী দিনেও আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজঘাটে প্রায় এক ঘণ্টা থাকার পর বিরোধী সাংসদেরা সেখান থেকে বেরিয়ে যান। তবে তাঁদের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট—জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামছে না। তিন দিনের ধারাবাহিক কর্মসূচিতে বিরোধীরা যে চাপের রাজনীতি বেছে নিয়েছে, রাজঘাটের কর্মসূচি সেই কৌশলকেই আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এল।



