রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে শুক্রবার রাতে দেখা করল বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন বিরোধী নেতারা। বৈঠক শেষে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়দের দাবি, তাঁদের বক্তব্য মন দিয়ে শুনেছেন রাষ্ট্রপতি। অভিযোগের সমর্থনে তথ্যপ্রমাণও চেয়েছেন তিনি। তবে এই বৈঠক নিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের তরফে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।
শুক্রবার রাত ৮টায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত ছিল। সেই মতো ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছয়। রাত ৯টার কিছু আগে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বৈঠককে ইতিবাচক বলে দাবি করেন বিরোধী নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়ায় একাধিক অনিয়ম হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করা ১০ সদস্যের দলে ছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা।
এ ছাড়াও প্রতিনিধি দলে ছিলেন সমাজবাদী পার্টির নেতা রাজীব রায়, এনসিপি (এসপি)-র নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা, আরজেডি সাংসদ মনোজ ঝা এবং ভিসিকে-র নেতা থোল তিরুমাভালাভন।
এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরা। অন্যদিকে, প্রতিনিধি দলের সদস্যরা যখন রাষ্ট্রপতি ভবনে বৈঠক করছিলেন, তখন বিজয় চকে বিক্ষোভ দেখান বিরোধী জোটের অন্য সাংসদেরা।
নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের জেরেই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করেছে বিরোধী দলগুলি। গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার ফর্ম-৬-এ পরিবর্তন, SIR-এর পরে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং যুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার অন্তত ১৪ বার আপত্তি নথিভুক্ত করেছিলেন বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও সামনে এসেছে। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছিল, সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সিদ্ধান্তগুলি সম্মিলিতভাবে নেওয়া হয়েছে। ফলে কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং কমিশনের ব্যাখ্যা—দুই বিষয়ই এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শুক্রবার বিকেলে সংসদের সেন্ট্রাল হলে বিরোধী সাংসদেরা নিজেদের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আন্দোলন কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
ওই বৈঠকে রাহুল গান্ধী বিরোধীদের আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে, বর্তমান সমস্যার পরিধি শুধু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে নয়, তার চেয়েও গভীর। তবে সরকারের পতন নিয়ে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তার পর থেকে দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় বিরোধী সাংসদদের বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়েছে। শনিবার যন্তর মন্তরে বড় সমাবেশেরও কর্মসূচি রয়েছে বলে বিরোধী শিবির সূত্রে জানা গিয়েছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগকে সাংবিধানিক স্তরে তুলে ধরতে চেয়েছে বিরোধী জোট। তবে বৈঠকে রাষ্ট্রপতির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত বিরোধী নেতাদের বক্তব্যই সামনে এসেছে। রাষ্ট্রপতি ভবনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত না হওয়ায় বৈঠকের বিষয়ে অন্য কোনও সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের কথা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এখন নজর শনিবারের যন্তর মন্তরের সমাবেশ এবং নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিরোধীদের পরবর্তী কর্মসূচির দিকে। ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বিরোধীদের অপসারণের দাবি—সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে।



