গুরু ছাড়া জ্ঞানের পথ অসম্পূর্ণ—ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই বিশ্বাস হাজার বছরের পুরনো। সেই কারণেই প্রতি বছর আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় গুরু পূর্ণিমা (Guru Purnima)। এই দিনটি কেবল গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উপলক্ষ নয়, বরং আত্মবিশ্লেষণ, জ্ঞান অর্জন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও বিশেষ দিন। ২০২৬ সালেও ২৯ জুলাই দেশজুড়ে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে উদযাপিত হবে গুরু পূর্ণিমা।
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে—গুরু পূর্ণিমা কেন পালিত হয়?, কেন একে ব্যাস পূর্ণিমা বলা হয়?, মহর্ষি বেদব্যাসের সঙ্গে এই দিনের সম্পর্ক কী? এই প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর তুলে ধরা হল।
গুরু পূর্ণিমা কেন পালিত হয়?
ভারতীয় দর্শনে গুরুকে ঈশ্বরের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘গু’ অর্থ অন্ধকার এবং ‘রু’ অর্থ সেই অন্ধকার দূরকারী। অর্থাৎ, গুরু হলেন সেই ব্যক্তি যিনি জ্ঞানের মাধ্যমে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে জীবনের সঠিক পথ দেখান।
এই কারণেই গুরু পূর্ণিমার দিন শিক্ষক, আধ্যাত্মিক গুরু, মেন্টর, বাবা-মা কিংবা জীবনের যে কোনও পথপ্রদর্শকের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
কেন একে ব্যাস পূর্ণিমা বলা হয়?
গুরু পূর্ণিমাকে ব্যাস পূর্ণিমা নামেও ডাকা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন মহর্ষি বেদব্যাস (Ved Vyasa)।
তিনি চারটি বেদের সংকলন করেন, রচনা করেন বিশ্বের অন্যতম মহাকাব্য মহাভারত (Mahabharata) এবং আঠারোটি পুরাণের সংকলনের কৃতিত্বও তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। ভারতীয় জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় দর্শনে তাঁর অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁকে ‘আদি গুরু’ হিসেবে সম্মান জানানো হয়।
তাই গুরু পূর্ণিমার দিন বেদব্যাসের স্মরণ ও গুরুবন্দনা একসঙ্গে পালিত হয়।

মহর্ষি বেদব্যাসের অবদান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ করে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মহর্ষি বেদব্যাসের অবদান অনন্য।
তাঁর প্রধান অবদানগুলির মধ্যে রয়েছে—
- চারটি বেদের সংকলন
- মহাভারত রচনা
- আঠারোটি পুরাণের সংকলন
- ব্রহ্মসূত্র রচনা (প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী)
- বৈদিক জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া
এই কারণেই তাঁকে ভারতীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঋষি হিসেবে সম্মান করা হয়।
হিন্দু ধর্মে গুরু পূর্ণিমার গুরুত্ব
সনাতন ধর্মে গুরু ছাড়া জ্ঞান লাভ অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। উপনিষদ থেকে শুরু করে ভগবদ্গীতা—সব ক্ষেত্রেই গুরুর গুরুত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে।
গুরু পূর্ণিমার দিনে বহু মানুষ তাঁদের আধ্যাত্মিক গুরুর আশ্রমে গিয়ে আশীর্বাদ নেন, গুরুদক্ষিণা প্রদান করেন এবং ধর্মীয় আচার পালন করেন। অনেকেই এই দিনে ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর’ মন্ত্র জপ করে গুরুকে স্মরণ করেন।
বৌদ্ধ ধর্মে গুরু পূর্ণিমার গুরুত্ব
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এই দিনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জ্ঞানলাভের পর গৌতম বুদ্ধ (Gautama Buddha) উত্তর প্রদেশের সারনাথ (Sarnath)-এ এই দিনেই তাঁর প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান করেছিলেন।
এই ঘটনাকে ধর্মচক্র প্রবর্তন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। তাই বহু বৌদ্ধ মঠে গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়।
জৈন ধর্মেও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব
জৈন ধর্মের অনুসারীরাও গুরু পূর্ণিমাকে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে পালন করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান মহাবীর (Mahavira)-এর প্রধান শিষ্য গৌতম স্বামী (Gautam Swami) এই দিনেই প্রথম আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভ করেছিলেন।
সেই কারণেই জৈন সম্প্রদায়ের কাছেও এই দিনটি গুরু-শিষ্য সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজকের সমাজে গুরুর গুরুত্ব কেন আরও বেড়েছে?
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সঠিক দিশা দেখানোর মানুষ খুবই প্রয়োজন। একজন প্রকৃত গুরু বা শিক্ষক কেবল বইয়ের জ্ঞান দেন না, বরং জীবনের মূল্যবোধ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মানবিকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।
তাই আজও স্কুলের শিক্ষক, গবেষণা-পরিচালক, মেন্টর, কোচ কিংবা বাবা-মা—সকলেই কোনও না কোনওভাবে গুরুর ভূমিকা পালন করেন।
গুরু পূর্ণিমায় কীভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়?
এই দিনে অনেকেই—
- গুরুকে প্রণাম করেন
- গুরুদক্ষিণা প্রদান করেন
- ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন
- আশ্রম বা মন্দিরে যান
- দান-ধ্যান করেন
- গুরুর আশীর্বাদ গ্রহণ করেন
- সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নেন
অনেক পরিবারে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মান জানিয়েও গুরু পূর্ণিমা উদযাপন করা হয়।
উপসংহার
গুরু পূর্ণিমা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি ভারতীয় সংস্কৃতির এক চিরন্তন মূল্যবোধের প্রতীক। মহর্ষি বেদব্যাসের স্মরণ, গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা—এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই পবিত্র দিন। তাই গুরু পূর্ণিমা আমাদের শুধু গুরুকে প্রণাম করতেই শেখায় না, বরং জীবনের প্রতিটি শিক্ষার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে শেখায়।



