গুরু পূর্ণিমা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও আত্মশুদ্ধির দিন। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, গুরুর আশীর্বাদ ছাড়া প্রকৃত জ্ঞান ও আত্মোপলব্ধি সম্ভব নয়। তাই প্রতি বছর আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বহু ভক্ত নিষ্ঠার সঙ্গে গুরু পূর্ণিমা (Guru Purnima) পালন করেন। কিন্তু অনেকেরই প্রশ্ন—গুরু পূর্ণিমায় কীভাবে পূজা করবেন? এই প্রতিবেদনে রইল পূজার সম্পূর্ণ নিয়ম, উপকরণ, মন্ত্র এবং প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পালনীয় আচার।
গুরু পূর্ণিমা কবে, পূর্ণিমা তিথি ও শুভ মুহূর্ত জানতে আগে এই প্রতিবেদনটি পড়ে নিতে পারেন।
👉 গুরু পূর্ণিমা ২০২৬: কবে, তিথি ও শুভ মুহূর্ত
গুরু পূর্ণিমার পূজা কখন করবেন?
২০২৬ সালে ২৯ জুলাই, বুধবার পালিত হবে গুরু পূর্ণিমা।
গুরু পূজার শুভ সময়
| অনুষ্ঠান | সময় |
|---|---|
| গুরু পূর্ণিমা | ২৯ জুলাই ২০২৬ |
| পূজার শুভ মুহূর্ত | সকাল ৫:৪১ – সকাল ৯:০৫ |
| রাহুকাল | দুপুর ১২:২৭ – দুপুর ২:০৮ |
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাহুকালের সময় নতুন শুভ কাজ বা পূজা শুরু না করাই শ্রেয়।
গুরু পূর্ণিমার পূজার জন্য কী কী উপকরণ লাগবে?
পূজার আগে নিচের উপকরণগুলি সংগ্রহ করে রাখতে পারেন—
- গুরুর ছবি বা প্রতিকৃতি
- মহর্ষি বেদব্যাসের ছবি (ইচ্ছানুযায়ী)
- পরিষ্কার আসন
- হলুদ বা সাদা ফুল
- চন্দন
- কুমকুম
- অক্ষত (আতপ চাল)
- তুলসী পাতা (প্রচলিত রীতি অনুযায়ী)
- ধূপ ও প্রদীপ
- ঘি
- ফল
- মিষ্টি
- নারকেল
- পবিত্র জল
- দক্ষিণা বা দানসামগ্রী

ধাপে ধাপে গুরু পূজার নিয়ম
ধাপ ১: স্নান ও শুদ্ধিকরণ
ভোরে উঠে স্নান করুন এবং পরিষ্কার বা হলুদ রঙের পোশাক পরুন। হলুদ রং বৃহস্পতি ও জ্ঞানের প্রতীক বলে বিবেচিত।
ধাপ ২: পূজাস্থান প্রস্তুত করুন
বাড়ির পূর্ব বা উত্তরমুখী পরিষ্কার স্থানে একটি আসন পেতে গুরুর ছবি বা প্রতিকৃতি স্থাপন করুন। চাইলে মহর্ষি বেদব্যাসের ছবিও রাখতে পারেন।
ধাপ ৩: প্রদীপ ও ধূপ জ্বালান
গুরুর সামনে ঘিয়ের প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করুন।
ধাপ ৪: ফুল ও চন্দন নিবেদন
গুরুর চরণে বা ছবির সামনে ফুল, চন্দন, অক্ষত ও কুমকুম নিবেদন করুন।
ধাপ ৫: ফল ও মিষ্টি অর্পণ করুন
ঋতুর ফল, মিষ্টি কিংবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নৈবেদ্য নিবেদন করুন।
ধাপ ৬: গুরু মন্ত্র জপ করুন
গুরু পূর্ণিমার দিনে বহু ভক্ত এই মন্ত্র জপ করেন—
গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ॥
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ১১, ২১ অথবা ১০৮ বার এই মন্ত্র জপ করা শুভ বলে মনে করা হয়।
‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর’ মন্ত্রের প্রতিটি শব্দের অর্থ ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা জানতে পড়ুন আমাদের বিশেষ প্রতিবেদন।
👉 গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর: শ্লোকের অর্থ ও মাহাত্ম্য
ধাপ ৭: গুরুদক্ষিণা প্রদান
যদি আপনার আধ্যাত্মিক গুরু বা শিক্ষক উপস্থিত থাকেন, তবে তাঁকে প্রণাম করে সামর্থ্য অনুযায়ী গুরুদক্ষিণা দিতে পারেন।
ধাপ ৮: আশীর্বাদ গ্রহণ
পূজার শেষে গুরুর আশীর্বাদ গ্রহণ করুন এবং পরিবারের প্রবীণ সদস্য, শিক্ষক বা অভিভাবকদেরও প্রণাম করুন।
গুরু পূর্ণিমায় কী দান করা শুভ বলে মনে করা হয়?
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এই দিনে—
- বই দান
- হলুদ বস্ত্র
- হলুদ ডাল
- ফল
- মিষ্টি
- ধর্মীয় গ্রন্থ
- শিক্ষাসামগ্রী
- দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের সহায়তা
শুভ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গুরু পূর্ণিমায় কী করা উচিত?
- গুরুকে প্রণাম করা
- শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মান জানানো
- ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা
- ধ্যান করা
- দান-পুণ্য করা
- গুরুর উপদেশ স্মরণ করা
- সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া
কী করা থেকে বিরত থাকবেন?
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই দিনে—
- গুরুর অসম্মান করা উচিত নয়
- অকারণে রাগ বা তর্ক এড়িয়ে চলা ভালো
- অসত্য কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত
- অন্যকে অপমান না করাই শ্রেয়
- রাহুকালের সময় নতুন শুভ কাজ শুরু না করাই ভালো
গুরু পূর্ণিমায় কোন মন্ত্র জপ করবেন?
সবচেয়ে জনপ্রিয় গুরু মন্ত্র—
গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ॥
এছাড়াও অনেকে ভগবদ্গীতা, বিষ্ণু সহস্রনাম বা গুরুগীতা পাঠ করেন।
গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে শিক্ষক, গুরু বা পথপ্রদর্শককে পাঠানোর জন্য সুন্দর বাংলা শুভেচ্ছাবার্তা খুঁজছেন? দেখে নিন—
👉 গুরু পূর্ণিমা ২০২৬: ১০০+ শুভেচ্ছা, Wishes ও Quotes
উপসংহার
গুরু পূর্ণিমা কেবল পূজা বা আচার পালনের দিন নয়; এটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আত্মবিশ্লেষণ এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, আন্তরিক ভক্তি, সৎ জীবনযাপন এবং গুরুর আশীর্বাদ গ্রহণই এই দিনের মূল বার্তা। তাই বাহ্যিক আচার পালনের পাশাপাশি নিজের জীবনেও গুরুর শিক্ষা অনুসরণ করাই গুরু পূর্ণিমার প্রকৃত তাৎপর্য।







