অম্বুবাচী শুরু হলেই বহু হিন্দু পরিবারে কিছু বিশেষ আচার ও বিধিনিষেধ মেনে চলার রীতি রয়েছে। শুধু দেবীমূর্তি বা ছবি ঢেকে রাখা নয়, লোকবিশ্বাস অনুযায়ী এই সময় মাটি কাটা, চাষাবাদ, শুভ কাজ কিংবা কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কেন এমন নিয়ম? আর এই সময় কী কী করা যায়? জেনে নিন অম্বুবাচী সম্পর্কিত প্রচলিত বিশ্বাস ও রীতিনীতির বিস্তারিত।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, সূর্য যখন আদ্রা নক্ষত্রে প্রবেশ করেন, তখন শুরু হয় অম্বুবাচী। প্রচলিত বিশ্বাসে এই সময় ধরিত্রীমাতা ঋতুমতী হন। তাই পৃথিবীকে বিশ্রাম দেওয়ার প্রতীক হিসেবেই কয়েকদিন ধরে কিছু কাজ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অম্বুবাচী শব্দের অর্থ ‘জলবৃদ্ধি’। কৃষিনির্ভর সমাজে এই সময়কে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। অনেকের বিশ্বাস, এই সময় প্রকৃতি নবজীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে এবং ধরিত্রীমাতার উর্বর শক্তির প্রকাশ ঘটে।
অম্বুবাচী চলাকালীন কোন কাজগুলি এড়িয়ে চলা উচিত?
দেবীপুজোয় বিরতি
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, অম্বুবাচীর সময় দেবীরাও বিশ্রাম নেন। তাই ঘরের সিংহাসনে থাকা দেবীদের ছবি বা মূর্তি লাল কাপড় বা অন্য কোনও শুদ্ধ বস্ত্র দিয়ে ঢেকে রাখার রীতি রয়েছে। অম্বুবাচী শেষ হলে পুনরায় নিয়মমাফিক পুজো শুরু করা হয়।
মাটি কাটা বা গাছ লাগানো নয়
ধরিত্রীমাতাকে আঘাত না করার প্রতীক হিসেবে এই সময় মাটি কাটা, খোঁড়াখুঁড়ি বা নতুন গাছ লাগানোর কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। অনেকেই বাগানের বড় কাজও এই কয়েকদিন স্থগিত রাখেন।
চাষাবাদ নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়
গ্রামীণ সমাজে অম্বুবাচীর সময় জমিতে চাষ না করার প্রচলন রয়েছে। কারণ এই সময় পৃথিবী মাতার বিশ্রামের সময় বলে বিশ্বাস করা হয়।
মন্ত্রপাঠে সংযম
অনেক আচার্য ও পুরোহিতের মতে, অম্বুবাচীর ক’দিন নিয়মিত দেবীপুজোর মন্ত্রপাঠ না করে শুধু ধূপ, প্রদীপ ও ফুল নিবেদন করাই শ্রেয়। যদিও বিভিন্ন অঞ্চলে এই রীতিতে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
শুভ কাজ ও ভ্রমণ এড়ানো
বিয়ে, গৃহপ্রবেশ, নতুন ব্যবসা শুরু বা অন্য কোনও মঙ্গলজনক কাজ অম্বুবাচীর সময় না করার রীতি বহু পরিবারে আজও প্রচলিত। একইভাবে দূরপাল্লার ভ্রমণও অনেকে এড়িয়ে চলেন।
চুল-নখ কাটা ও বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত
লোকবিশ্বাসে অম্বুবাচীর সময় চুল বা নখ কাটা শুভ নয়। পাশাপাশি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, সম্পত্তি কেনাবেচা বা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্তও অনেকেই এই সময়ে স্থগিত রাখেন।
অম্বুবাচীর সময় কী কী করা যায়?
গুরুপ্রদত্ত মন্ত্র জপ
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, গুরুপ্রদত্ত মন্ত্র জপ বা ব্যক্তিগত সাধনা এই সময় করা যায়। অনেক সাধক এই সময়কে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য বিশেষ উপযোগী বলে মনে করেন।
দেবীকে আম-দুধ নিবেদন
অম্বুবাচী শেষ হওয়ার পর দেবীমূর্তি বা ছবি শুদ্ধ করে আম ও দুধ নিবেদন করার রীতি বহু জায়গায় প্রচলিত।
তুলসীগাছের যত্ন
এই সময় তুলসীগাছের গোড়ার মাটি আলগা হয়ে গেলে তা ঠিক করে দেওয়া বা মাটি চাপা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি গাছের সুরক্ষা ও পরিচর্যার অংশ হিসেবে বিবেচিত।
আম-দুধ খাওয়ার বিশ্বাস
লোকবিশ্বাসে অম্বুবাচীর ক’দিন আম ও দুধ খেলে সাপের ভয় কমে। যদিও এই বিশ্বাসের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও বহু মানুষ এখনও এই প্রথা অনুসরণ করেন।
অম্বুবাচীকে ঘিরে প্রচলিত এই নিয়মগুলি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কেউ এগুলি মেনে চলেন, কেউ আবার ব্যক্তিগত বিশ্বাস অনুযায়ী ভিন্ন পথ বেছে নেন। তবে অম্বুবাচী আজও ভারতীয় আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
🔗 সম্পর্কিত প্রতিবেদন
-
- অম্বুবাচী কী? কেন ৩ দিন মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে? জানুন এর ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
- অম্বুবাচী সময় সূচি ২০২৬, কী বলছে বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা
- অম্বুবাচী ২০২৬ শুরু ২২ জুন থেকে! কখন লাগবে অশৌচ, জেনে নিন কলকাতা ও বাংলাদেশের নির্ভুল সময়সূচি
- অম্বুবাচীর ৩ দিন কী কী করা নিষেধ? শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাস কী বলছে
- অম্বুবাচীতে চুল, নখ কাটলে কী হয়? প্রচলিত বিশ্বাস কতটা সত্য, জানুন বিস্তারিত
- অম্বুবাচী মেলা: ঋতুস্রাব হলে মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ, তবে কামাখ্যায় কেন দেবীর ‘মাসিক’ উৎসব?



