অম্বুবাচী মেলা ২০২৬ শুরু হল ২২ জুন থেকে। একদিকে ঋতুস্রাবের সময় বহু মন্দিরে নারীদের প্রবেশ নিয়ে বিধিনিষেধের প্রচলন রয়েছে, অন্যদিকে আসামের কামাখ্যা মন্দিরে দেবীর ঋতুচক্রকেই পবিত্র উৎসব হিসেবে উদযাপন করা হয়। এই দ্বৈত বিশ্বাস ঘিরেই ফের আলোচনায় এসেছে হিন্দু ধর্মে ঋতুস্রাব ও আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক।
সোমবার, ২২ জুন থেকে শুরু হয়েছে অম্বুবাচী মেলা, যা চলবে ২৬ জুন পর্যন্ত। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, সূর্য যখন আদ্রা নক্ষত্রে প্রবেশ করে, তখনই অম্বুবাচীর সূচনা হয়। লোকবিশ্বাসে এই সময় ধরিত্রী বা পৃথিবী মাতাকে ঋতুমতী বলে মনে করা হয় এবং সেই কারণেই এই পর্বকে উর্বরতা, সৃষ্টি ও নবজীবনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
‘অম্বুবাচী’ শব্দের অর্থ জলবৃদ্ধি। কৃষিনির্ভর সমাজে এই সময়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ মনে করা হয় পৃথিবী তখন সন্তান ধারণের উপযোগী হয়ে ওঠে। এই কারণেই অম্বুবাচী শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, প্রকৃতি ও জীবনের চক্রের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঋতুস্রাব নারীর শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। গর্ভধারণ না হলে জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আস্তরণ নির্দিষ্ট সময় অন্তর ঝরে পড়ে। সাধারণত তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে পারে এবং এটি নারী শরীরের স্বাভাবিক বিকাশেরই অংশ।
তবে ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিভিন্ন স্তরে ঋতুস্রাবকে ঘিরে নানা বিশ্বাস ও বিধিনিষেধ গড়ে উঠেছে। হিন্দুধর্মের কিছু প্রাচীন গ্রন্থ, যেমন মনুস্মৃতি ও কয়েকটি পুরাণে ঋতুস্রাবের সময় নারীদের ধর্মীয় আচার থেকে দূরে থাকার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই সূত্রেই বহু স্থানে ঋতুস্রাবকে ‘অশুচি’ হিসেবে দেখার ধারণা তৈরি হয়েছে।
আরও একটি প্রচলিত বিশ্বাস হল, ঋতুস্রাবের সময় নারীর শরীরের শক্তির প্রবাহ মন্দিরের আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। অনেকের মতে, মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবমূর্তির মধ্যে যে ‘প্রাণশক্তি’ বিরাজ করে, তা এই সময়ে ব্যাহত হতে পারে। যদিও এই ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও বহু মন্দিরে তা এখনও অনুসৃত হয়।
কেরালার সবরিমালা মন্দির এই বিতর্কের অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ঋতুস্রাবকালীন বয়সের নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। মন্দির কর্তৃপক্ষের যুক্তি, ভগবান আয়াপ্পা আজীবন ব্রহ্মচারী এবং তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে এই নিয়ম যুক্ত।
তবে হিন্দুধর্মের সব ধারায় একই ব্যাখ্যা দেখা যায় না। অনেক মন্দির ও আধ্যাত্মিক পরম্পরায় ঋতুস্রাবকে নারীর শক্তি, সৃজনশীলতা এবং মাতৃত্বের প্রতীক হিসেবেও সম্মান জানানো হয়। সেখানে ঋতুচক্রকে অপবিত্র নয়, বরং জীবনের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
এই ভিন্ন দর্শনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ আসামের বিখ্যাত কামাখ্যা মন্দির। প্রতি বছর অম্বুবাচী মেলার সময় তিন দিনের জন্য মন্দিরের দরজা বন্ধ রাখা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই সময় দেবী কামাখ্যা ঋতুমতী হন। পরে মন্দির পুনরায় খুলে দেওয়া হলে লক্ষ লক্ষ ভক্ত সেখানে ভিড় জমান।
কামাখ্যা মন্দিরে দেবীর ঋতুস্রাবকে অপবিত্র নয়, বরং শক্তি, উর্বরতা ও সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। গর্ভগৃহ লাল বস্ত্রে আবৃত করা হয় এবং ভক্তদের মধ্যে সেই পবিত্র বস্ত্র বিতরণ করা হয়। এখানেই অম্বুবাচী মেলা অন্যসব প্রচলিত ধারণার থেকে আলাদা হয়ে ওঠে।
ঋতুস্রাবকে ঘিরে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও বিতর্কের বিষয়। তবে কামাখ্যা মন্দিরের অম্বুবাচী উৎসব দেখায়, একই ধর্মীয় পরিসরের মধ্যেও ঋতুচক্রকে কখনও নিষেধাজ্ঞার নয়, বরং সৃষ্টি, পুনর্জন্ম ও নারীত্বের শক্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা সম্ভব।
🔗 সম্পর্কিত প্রতিবেদন
-
- অম্বুবাচী কী? কেন ৩ দিন মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে? জানুন এর ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
- অম্বুবাচী সময় সূচি ২০২৬, কী বলছে বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা
- অম্বুবাচী ২০২৬ শুরু ২২ জুন থেকে! কখন লাগবে অশৌচ, জেনে নিন কলকাতা ও বাংলাদেশের নির্ভুল সময়সূচি
- অম্বুবাচীর ৩ দিন কী কী করা নিষেধ? শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাস কী বলছে
- অম্বুবাচীতে চুল, নখ কাটলে কী হয়? প্রচলিত বিশ্বাস কতটা সত্য, জানুন বিস্তারিত



