৩৭৪ দিন পর জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠক, মোবাইলে কর কমার কথা আলোচনা হতে পারে

৩৭৪ দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠক। আইটিসি, ইনভার্টেড ডিউটি, রিফান্ড ও কমপেনসেশন সেসের পাশাপাশি মোবাইল ফোনে ১৮ শতাংশ জিএসটি কমানোর প্রস্তাব নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

৩৭৪ দিন পর ফের বৈঠকে বসতে চলেছে জিএসটি কাউন্সিল (GST Council)। আগামী ১২ সেপ্টেম্বরের বৈঠক ঘিরে তাই প্রত্যাশা তুঙ্গে। এবার শুধু করের হার পুনর্বিন্যাস নয়, ব্যবসার কর মেটানোর প্রক্রিয়া সহজ করা, আটকে থাকা ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (ITC) ছাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কমানোর মতো বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে।

জিএসটি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা ‘ইনভার্টেড ডিউটি স্ট্রাকচার’। অর্থাৎ, কোনও পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল বা পরিষেবার উপর যে হারে জিএসটি দিতে হচ্ছে, অনেক সময় চূড়ান্ত পণ্যের ক্ষেত্রে তার চেয়ে কম কর বসছে। এর ফলে উৎপাদনকারী সংস্থার হাতে অতিরিক্ত আইটিসি জমে যাচ্ছে।

বস্ত্র, ওষুধ এবং এফএমসিজি-সহ একাধিক শিল্পক্ষেত্রে এই সমস্যা বহুদিনের। কর উপদেষ্টা সংস্থা খৈতান অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার ব্রিজেশ কোঠারির মতে, জিএসটি ২.০-তে করের স্ল্যাব সরল করার পরেও ইনভার্টেড ডিউটির সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি।

২০২৬ সালের বাজেটে অন্তর্বর্তীকালীন রিফান্ডের ব্যবস্থা কিছুটা স্বস্তি দিলেও মূল সমস্যার সমাধান হয়নি। কারণ, বর্তমান রিফান্ডের সূত্রে ইনপুট সার্ভিসের ক্রেডিট ধরা হচ্ছে না। পরিষেবার ক্ষেত্রে দেওয়া জিএসটির ক্রেডিটও ফেরত দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হলে আইনে সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করছেন ব্রিজেশ কোঠারি।

একই সমস্যার দিকে নজর দিয়েছেন নাঙ্গিয়া গ্লোবাল-এর পরোক্ষ কর বিভাগের এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর শিবকুমার রামজি। অর্থাৎ, শুধু পণ্যের উপর করের কাঠামো নয়, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত পরিষেবার কর-ক্রেডিট কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইটিসি নিয়ে অনিশ্চয়তা অবশ্য ইনভার্টেড ডিউটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্যাক্স কানেক্ট অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পার্টনার বিবেক জালানের মতে, কোনও সরবরাহকারী নিজের করের দায় মেটাতে ব্যর্থ হলে নিয়ম মেনে চলা ক্রেতার প্রাপ্য আইটিসি যাতে নষ্ট না হয়, তার জন্য আইন এবং প্রযুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন দরকার।

জিএসটি ২.০ চালু হওয়ার পর পুরনো এবং ট্রানজিশনাল ক্রেডিটের ভবিষ্যৎ নিয়েও স্পষ্টতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের হাতে মজুত থাকা পণ্যের সঙ্গে যুক্ত বৈধ ট্যাক্স ক্রেডিট কীভাবে ব্যবহৃত বা সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশিকা না থাকলে নতুন করে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এর পাশাপাশি নজরে রয়েছে কমপেনসেশন সেস। ধ্রুব অ্যাডভাইজর্সের রঞ্জিত মাহতানির হিসেব অনুযায়ী, কর ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার পর কয়েকটি শিল্পে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার সেস আটকে বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। অটোমোবাইল শিল্প এবং কয়লা ব্যবহারকারী সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে দেখা গিয়েছে।

এই অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা কোনও কোনও সংস্থা নিজেরাই বহন করেছে, আবার কেউ তা পণ্যের দামের মাধ্যমে ক্রেতাদের উপর চাপিয়েছে। অন্যদিকে, জমে থাকা অর্থ ফেরতের দাবিতে কয়েকটি সংস্থা আইনি পথও বেছে নিয়েছে। ফলে এই অর্থের ব্যবহার, সমন্বয় বা নিষ্পত্তির বিষয়ে জিএসটি কাউন্সিলের একটি স্পষ্ট রূপরেখা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কর ব্যবস্থাকে আরও স্বয়ংক্রিয় এবং ব্যবসাবান্ধব করার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে। রিফান্ডের ক্ষেত্রে জিএসটিএন (GSTN) এবং ই-ইনভয়েসের তথ্য কাজে লাগিয়ে ঝুঁকি-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে। এতে নিয়ম মেনে চলা ব্যবসার ক্ষেত্রে রিফান্ড পাওয়ার সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।

একাধিক রাজ্যে ব্যবসা করা সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও আইটিসি ব্যবস্থাপনা সহজ করার প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের রেজিস্ট্রেশনের মধ্যে ক্রেডিট ব্যবহারের প্রক্রিয়া আরও সরল করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। নির্মাণ এবং ওয়ার্কস কনট্র্যাক্টের ক্ষেত্রে কোন ধরনের ইনপুট ক্রেডিট দেওয়া বা আটকে রাখা হবে, সেটিও ফের বিবেচনায় আসতে পারে।

এবারের বৈঠকে মোবাইল ফোনে জিএসটির হার ১৮ শতাংশ থেকে কমানোর প্রস্তাব উঠতে পারে বলেও জল্পনা রয়েছে। তবে ১২ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে কোন প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে জায়গা পাবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

জিএসটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলা কমানোও এবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও বিষয় আদালতে যাওয়ার আগেই প্রশাসনিক স্তরে তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট করা গেলে মামলার সংখ্যা কমবে। আইটিসি, ‘প্লেস অব সাপ্লাই’ এবং পণ্যের শ্রেণিবিন্যাসের মতো বিতর্কিত বিষয়ে ‘আগে ব্যাখ্যা, পরে মামলা’ নীতি চালু হলে করদাতা এবং সরকার—দুই পক্ষেরই সময় ও খরচ বাঁচতে পারে।

সব মিলিয়ে, ১২ সেপ্টেম্বরের জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠক শুধুমাত্র করের হার নিয়ে সিদ্ধান্তের মঞ্চ হয়ে না উঠে জিএসটি ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যাগুলি মেটানোর দিকে কতটা এগোয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আইটিসি, রিফান্ড, কমপেনসেশন সেস এবং আইনি জটিলতা নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হলে ব্যবসায়ী মহলে তার প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন