২০২২ সাল থেকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম একটানা ঊর্ধ্বমুখী। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির অস্বাভাবিক মাত্রায় স্বর্ণ কেনা। বিশ্ব সোনালী কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি রেকর্ড পরিমাণ সোনা কিনেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
২০২২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি কিনেছিল ১,০৮২ টন সোনা। ২০২৩ সালে সেই পরিমাণ হয় ১,০৩৭ টন। আর ২০২৪ সালে তা বেড়ে পৌঁছায় ১,১৮০ টনে। এত বিপুল পরিমাণ সোনা কেনার ফলে বাজারে সোনার সরবরাহ কমেছে, আর দাম চড়েছে হু হু করে।



বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চাহিদাই নয়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবেও এখন সোনার প্রতি ঝুঁকছে দেশগুলির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বহু দেশ ডলারের পরিবর্তে সোনাকে রিজার্ভ হিসাবে রাখতে শুরু করেছে। ফলে স্বর্ণের দাম বাড়ছে দ্রুত গতিতে।
মাত্র ৩ বছরে ৯০% বৃদ্ধি, বাজারে বিস্ময়
২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ১,৭৩০ মার্কিন ডলার। আর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা পৌঁছেছে ৩,৩৩০ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরে প্রায় ৯০% মূল্যবৃদ্ধি। বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি এক বিশাল লাভের সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে সোনার অংশ ২০%-এ পৌঁছেছে। ডলার (৪৬%) ছাড়া সোনাই এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম রিজার্ভ সম্পদ, এমনকি ইউরো (১৬%)-কেও পিছনে ফেলেছে।



স্বর্ণ কেনা কমলেও দাম কমেনি, বলছে রিপোর্ট
২০২৫ সালের প্রথম এবং দ্বিতীয় কোয়ার্টারে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনা কেনার গতি কিছুটা কমেছে। প্রথম কোয়ার্টারে কেনা হয় ২৪৪ টন এবং দ্বিতীয় কোয়ার্টারে ১৬৬ টন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এতেও সোনার দাম তেমনভাবে কমছে না, বরং দাম এখনও স্থিতিশীল থেকে ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এর কারণ হল, সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও এখন সোনাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখছেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ-সংঘর্ষ, মুদ্রাস্ফীতি এবং রিজার্ভ কারেন্সিতে আস্থার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও সোনায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
ভারতের বাজারেও প্রভাব স্পষ্ট
ভারতে স্বর্ণ হল আবেগের বস্তু—বিয়ের মৌসুম হোক কিংবা উৎসব, সোনার চাহিদা সবসময় থাকে তুঙ্গে। কিন্তু এখন সোনার দাম বাড়তে বাড়তে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ইতিমধ্যে ৭৩,০০০ টাকা ছুঁয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি এভাবে সোনা জমা করতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকে, তাহলে আগামী দিনে সোনার দাম আরও বাড়তে পারে।

ভবিষ্যৎ কী বলছে?
বিশ্ব সোনালী কাউন্সিল (WGC)-এর ভবিষ্যৎ রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী এক বছরে সোনার দাম ৫%-১০% বাড়তে পারে। তবে এটি নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির কেনাকাটা, বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতি এবং মার্কিন ডলারের অবস্থানের উপর।
বর্তমানে যারা সোনায় বিনিয়োগ করছেন, তাঁদের জন্য এই সময়টি লাভজনক হতে পারে। তবে নতুন বিনিয়োগকারীদের উচিত ভাবনাচিন্তা করে পা ফেলা। বিশেষ করে স্বর্ণের দাম যেহেতু ইতিমধ্যেই উচ্চমাত্রায় রয়েছে, তাই বিনিয়োগের ঝুঁকি খতিয়ে দেখা জরুরি।
সোনার দাম বৃদ্ধির পিছনে আসল কারণ হল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ কেনা। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশগুলি ডলারের পাশাপাশি সোনাকে বেছে নিচ্ছে। এর ফলে বাজারে সোনার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, আর সেই চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান থেকেই তৈরি হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি। তাই আগামী দিনে সোনার বাজারে নজর রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



