সোনার দাম ৩ লক্ষ টাকা ছুঁতে পারে? ক্রিস্টোফার উডের পূর্বাভাস, কেন বাড়তে পারে দর

সোনার দাম দীর্ঘমেয়াদে ৩ লক্ষ টাকা ছুঁতে পারে বলে পূর্বাভাস ক্রিস্টোফার উডের। আন্তর্জাতিক বাজারে ১০ হাজার ডলার প্রতি আউন্সের লক্ষ্যের পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

সোনার দামে ফের বড়সড় উত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। Jefferies-এর গ্লোবাল ইকুইটি স্ট্র্যাটেজির প্রধান ক্রিস্টোফার উড (Christopher Wood) দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ১০ হাজার ডলারে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন। সেই হিসাব ভারতীয় মুদ্রায় ধরলে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম প্রায় ৩ লক্ষ টাকার কাছাকাছি যেতে পারে। তবে এটি কোনও স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার কথা।

এই মুহূর্তে ভারতের বাজারে সোনার দর ইতিমধ্যেই রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ২৪ ক্যারাট সোনার দাম বিভিন্ন বাজারে প্রায় ১.৫৫ লক্ষ টাকা প্রতি ১০ গ্রামের আশপাশে ছিল। ফলে ৩ লক্ষ টাকার স্তরে পৌঁছতে হলে বর্তমান দরের তুলনায় দামকে প্রায় দ্বিগুণ হতে হবে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সোনার দাম এবং ভারতের খুচরো সোনার দাম এক নয়। আন্তর্জাতিক স্পট প্রাইসের পাশাপাশি ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হার, আমদানি সংক্রান্ত খরচ, কর এবং স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতিও ভারতের দামে প্রভাব ফেলে। গয়নার ক্ষেত্রে এর সঙ্গে মেকিং চার্জের মতো অতিরিক্ত খরচও যুক্ত হয়।

ক্রিস্টোফার উডের পূর্বাভাসের পিছনে রয়েছে একাধিক অর্থনৈতিক কারণ। তাঁর বিশ্লেষণে আর্থিক অনিশ্চয়তা, সুদের হার, মার্কিন অর্থনীতির পরিস্থিতি এবং বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েন সোনার চাহিদাকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশেষ করে সুদের হার কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে সোনার মতো সুদ না-দেওয়া সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে। একইসঙ্গে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে ঝুঁকি কমানোর জন্য কিছু বিনিয়োগ সোনার দিকে সরতে পারে। সেই কারণেই মুদ্রানীতি ও আর্থিক বাজারের পরিস্থিতি সোনার দামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগও উডের বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভবিষ্যতে এই বিনিয়োগের গতি কমে গেলে এবং তার প্রভাবে মার্কিন অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হলে বাজারে ফের আর্থিক নীতি শিথিল করার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতি সোনার জন্য সহায়ক হতে পারে বলে তাঁর বিশ্লেষণ।

ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও সোনার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত, বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়লে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে সোনার চাহিদা এবং দাম—দুটিই বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনা কেনাও এই দীর্ঘমেয়াদি গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। World Gold Council-এর ২০২৬ সালের সমীক্ষায় ৮৯ শতাংশ রিজার্ভ ম্যানেজার জানিয়েছেন, আগামী ১২ মাসে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনার মজুত বাড়তে পারে। ৪৫ শতাংশ নিজেদের প্রতিষ্ঠানেও সোনার মজুত বাড়ানোর প্রত্যাশা জানিয়েছেন।

World Gold Council-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির নিট সোনা কেনার পরিমাণ ছিল ৩৪৫ টন। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে কেনাকাটা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ২৮৯ টনে পৌঁছেছিল। ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার প্রবণতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে সোনার দাম সবসময় একমুখী পথে বাড়ে না। সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে, ডলার শক্তিশালী হলে বা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়লে সোনার দামে চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে ক্রিস্টোফার উডের ১০ হাজার ডলার প্রতি আউন্সের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ দাম হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি হিসেবে দেখা জরুরি।

অর্থাৎ, সোনার দাম ৩ লক্ষ টাকা ছুঁতে পারে—এমন সম্ভাবনার কথা উঠে এলেও তার জন্য আন্তর্জাতিক বাজার, মার্কিন সুদের হার, ডলারের গতিপ্রকৃতি, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কেনাকাটা এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি একসঙ্গে অনুকূল হতে হবে। আপাতত এটি দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস, আগামী দিনেই ৩ লক্ষ টাকা হয়ে যাওয়ার কোনও নিশ্চিত ইঙ্গিত নয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন