ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের সংঘাত নতুন মাত্রা পেল। কমিশন রাজ্যের আরও সাত আধিকারিককে অবিলম্বে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়ে নবান্নে চিঠি পাঠিয়েছে। অভিযোগ—এসআইআর-এর কাজে অসদাচরণ, গাফিলতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। আগেই চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআর-এর নির্দেশ জারি হয়েছিল। তার মধ্যেই এই নতুন পদক্ষেপে প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এইআরও-রা বিধি মেনে কাজ করেননি। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী সাত জনকেই অবিলম্বে নিলম্বিত করতে হবে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে, এই নির্দেশ কার্যকর করার পর রাজ্য সরকার কী ব্যবস্থা নিল, তা দ্রুত কমিশনকে জানাতেও বলা হয়েছে।


এই সাত আধিকারিকের মধ্যে তিন জন মুর্শিদাবাদ জেলার, দু’জন দক্ষিণ ২৪ পরগনার, একজন জলপাইগুড়ির এবং একজন পশ্চিম মেদিনীপুরের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্বের দুই এইআরও সত্যজিৎ দাস ও জয়দীপ কুন্ডু, জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ির ডালিয়া রায়চৌধুরী, মুর্শিদাবাদের সমশেরগঞ্জের শেফাউর রহমান, ফরাক্কার নীতীশ দাস, সুতির শেখ মুর্শিদ আলম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরার দেবাশিস বিশ্বাস—এই সাত জনের বিরুদ্ধেই সাসপেনশনের নির্দেশ জারি হয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগেই রাজ্যের চার আধিকারিককে সাসপেন্ড করে তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকায় ‘ভুয়ো’ বা ‘ভূতুড়ে’ নাম অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। ওই চার জন হলেন তথাগত মণ্ডল, দেবোত্তম দত্তচৌধুরী, বিপ্লব সরকার ও সুদীপ্ত দাস। ডেটা এন্ট্রির কাজে যুক্ত সুরজিৎ হালদারের বিরুদ্ধেও এফআইআর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু কমিশনের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত এফআইআর দায়ের হয়নি। সেই কারণেই শুক্রবার দিল্লিতে নির্বাচন সদনে তলব করা হয় রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে। পরবর্তী পর্যায়ে কমিশন রাজ্যকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় দিয়েছে এফআইআর সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। তার মধ্যেই রবিবার নতুন করে সাত আধিকারিকের বিরুদ্ধে সাসপেনশনের নির্দেশ জারি করে চিঠি পাঠানো হয়েছে।


ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের অগস্টে। ৫ ও ৮ অগস্ট কমিশন নবান্নকে পরপর দু’টি চিঠি পাঠিয়ে অনিয়মের অভিযোগ জানায়। সে সময় নবান্ন জানায়, ময়না বিধানসভা কেন্দ্রের সহকারী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক সুদীপ্ত দাস এবং বারুইপুর পূর্বের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর সুরজিৎ হালদারকে নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বাকিদের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ কোনও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এরপর গত ২ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট দুই জেলাশাসককে এফআইআর করার নির্দেশ দেয় কমিশন। কিন্তু সেই নির্দেশও কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ। সিইও দফতর থেকে জেলাশাসকদের দু’বার রিমাইন্ডার পাঠানো হয়। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় নবান্ন রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেলের কাছে আইনি পরামর্শ চায়।
রাজ্যের তরফে কমিশনকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘এফআইআর করার মতো গুরুতর নয়’। তাদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত না-হওয়া পর্যন্ত কঠোর ফৌজদারি পদক্ষেপ যুক্তিযুক্ত নয়। তবে কমিশন তার অবস্থানে অনড় থেকেছে।
এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজ্য ও কমিশনের এই টানাপোড়েন এখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামনে ভোটের প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকা নিয়ে কোনও অনিয়মের অভিযোগই স্পর্শকাতর। ফলে কমিশনের এই ধারাবাহিক কড়া অবস্থান এবং রাজ্যের পাল্টা আইনি ব্যাখ্যা—দুইয়ের সংঘাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।







