বাংলার দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম বড় ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরতে এবার বড়সড় ডিজিটাল প্রচারে নামছে রাজ্য সরকার। ‘বিশ্বজুড়ে বাঙালির আবেগ—দুর্গাপুজো গ্লোবাল কানেক্ট ২০২৬’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলার পুজোর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিল্প ও আবেগ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই প্রচারের জন্য অন্তত ২,৬০০ জন ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিয়োগের ভাবনা রয়েছে। তবে আবেদন করতে হলে তাঁদের প্রত্যেকের ন্যূনতম ১০ লক্ষ ফলোয়ার বা সাবস্ক্রাইবার থাকতে হবে।
রাজ্য পর্যটন দপ্তরের পরিকল্পনা শুধু প্রবাসী বাঙালিদের কাছে দুর্গাপুজোর প্রচারেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে বাংলার পুজোকে সাংস্কৃতিক ও পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য। নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ার, দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, লন্ডনের পিকাডিলি লাইটস, সিডনি এবং জাপানের বিমানবন্দরগুলির মতো আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলার দুর্গাপুজোর উপস্থিতি তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুজোর কোন দিকগুলি বিদেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে, তারও একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিমা তৈরি থেকে শিল্পীদের কাজ, পুজোর থিম, আলোকসজ্জা, খাবার, পোশাক ও ফ্যাশন—সবকিছুর পাশাপাশি বাঙালির আবেগ ও উৎসবের পরিবেশকেও প্রচারের অংশ করা হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র পুজো দেখা নয়, বাংলার জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে দুর্গাপুজোর সম্পর্কটিও তুলে ধরতে চাইছে পর্যটন দপ্তর।
ভাষার বৈচিত্র্যের বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়েছে। অন্তত ১০টি দেশের ২৫টি বাঙালি সংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের দর্শকদের কাছে যাতে প্রচারের বিষয়বস্তু সহজে পৌঁছয়, সে জন্য দেশভেদে আলাদা বিজ্ঞাপন ও ভিডিও কনটেন্ট তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই বিশাল প্রচার অভিযান বাস্তবায়নের জন্য পেশাদার সংস্থাকেও দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে চলেছেন ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। পর্যটন, ভ্রমণ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন—এমন ইনফ্লুয়েন্সারদের সংখ্যাই বেশি রাখা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রায় ৬০ শতাংশ থাকবেন ট্রাভেল, ট্যুরিজম, কালচার ও হেরিটেজ কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত। বাকি ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকবেন খাবার, শিল্প, ফ্যাশন, লাইফস্টাইল এবং ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করা কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। অর্থাৎ দুর্গাপুজোকে শুধু ধর্মীয় উৎসব হিসেবে নয়, বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরাই প্রচারের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে ইনফ্লুয়েন্সার বাছাইয়ে বড় শর্ত রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে নির্বাচন হবে না; ভিউ এবং রিচও বিবেচনায় রাখা হবে। যাঁদের ফলোয়ার বা সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা অন্তত ১০ লক্ষ, তাঁরাই এই প্রচার অভিযানে অগ্রাধিকার পাবেন। বিশেষ করে বিদেশে বসবাসকারী বাঙালি ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষেত্রে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার মিলিয়ে মোট ২০০ কোটি ভিউ ও ইমপ্রেশন তৈরি করাই রাজ্য পর্যটন দপ্তরের লক্ষ্য। ইতিমধ্যেই এই কাজের জন্য ‘রিকোয়েস্ট ফর প্রোপোজাল’ বা RFP প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে পরিকল্পনাটি এখন শুধু ভাবনার স্তরে নেই, বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
বাংলার দুর্গাপুজো ইতিমধ্যেই ইউনেস্কোর (UNESCO) ‘Intangible Cultural Heritage of Humanity’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে। এবার সেই আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে পুজোকে বিশ্ব পর্যটনের বড় আকর্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়েছে রাজ্য সরকার। ২০২৬-এর পুজোয় সোশ্যাল মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রচারের মাধ্যমে বাংলার উৎসব কতটা নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছয়, সেটাই এখন দেখার।



