আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে (US Midterm Elections 2026) রিপাবলিকানদের বড়সড় পরাজয়ের পরেও নিজের অবস্থান থেকে সরতে নারাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। একদিকে নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি, অন্যদিকে বিরোধীদের প্রস্তাবিত কোনও আইন পছন্দ না হলে তাতে ভেটো প্রয়োগের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের দায় নিজের কাঁধে নিতে নারাজ ট্রাম্পের দাবি, তিনি নিজে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হত।
নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হওয়ার পর ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ায় একদিকে ছিল পরাজয়ের দায় এড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে আগামী দু’বছরের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তাঁর প্রশাসনের সামনে এখন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসতেই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social)-এ একটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, তিনি ব্যালটে ছিলেন না। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হত। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে কোনও নির্বাচনী পরিসংখ্যান বা প্রমাণ অবশ্য দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
উল্লেখ্য, নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের হয়ে একাধিক প্রচারসভায় অংশ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ভোট দেওয়ার সময় যেন তাঁরা মনে করেন, ট্রাম্প নিজেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিন্তু ফলাফলে সেই প্রচারের প্রত্যাশিত প্রতিফলন দেখা যায়নি।
ট্রাম্পের পরাজয় স্বীকারের প্রশ্নেও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের ফল মেনে নেবেন কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ফলাফল মেনে নিতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার বিষয়েও ইতিবাচক বার্তা দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করবে এবং কোনও সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
কিন্তু এই সমঝোতার বার্তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পর আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা যদি এমন কোনও আইন তাঁর কাছে পাঠায়, যা তাঁর বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য নয়, তা হলে তিনি তাতে ভেটো দেবেন। নিজের অবস্থান বোঝাতে পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘VETO’ লেখা একটি টুপির ছবিও প্রকাশ করেন তিনি।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চাপে রিপাবলিকানরা: ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয় মার্কিন রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ (House of Representatives) এবং সেনেট (Senate)—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিরোধীদের বাধার মুখে পড়ার সম্ভাবনা বেড়েছে।
বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত শুরু করা, সরকারি নথি তলব করা এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের নজরদারিও আরও কঠোর হতে পারে।
ভেটো ক্ষমতা কতটা কার্যকর হতে পারে?
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনও বিলে ভেটো প্রয়োগ করতে পারেন। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটোই কোনও বিলের চূড়ান্ত পরিণতি নয়। প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন থাকলে প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করে বিল আইনে পরিণত করা সম্ভব।
অর্থাৎ, কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকছে। ফলে আগামী দু’বছরে হোয়াইট হাউস এবং কংগ্রেসের মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনে পরাজয়ের পর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার কথা বললেও নিজের প্রশাসনিক ক্ষমতা খর্ব করতে যে তিনি রাজি নন, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। একদিকে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতার বার্তা, অন্যদিকে ভেটোর হুঁশিয়ারি—এই দুই অবস্থান নিয়েই মেয়াদের বাকি সময় কাটাতে হতে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে।



