স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সমাজমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করল একই নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক পেজ। ‘দিমাগি নকশাল জনতা পার্টি’ নামে তৈরি ওই অ্যাকাউন্টকে ঘিরে অল্প সময়েই নেটদুনিয়ায় ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। পেজটির পোস্টে মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে কটাক্ষ এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয় তুলে ধরা হচ্ছিল। তবে অ্যাকাউন্টটির পিছনে কারা রয়েছেন, তা প্রকাশ্যে জানা যায়নি।
১৫ অগস্ট লালকেল্লার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মাওবাদী হিংসার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সশস্ত্র নকশালদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিরাপত্তাবাহিনী সাফল্য পেলেও ‘নকশাল মানসিকতা’র একটি অংশ এখনও সমাজে সক্রিয়। তাঁর বক্তব্যে ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধটি সামনে আসে। প্রধানমন্ত্রী এই ধরনের মতাদর্শগত প্রভাবকে চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই ওই শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ শুরু হয়। ‘দিমাগি নকশাল জনতা পার্টি’ নামে তৈরি পেজটি সেই ব্যঙ্গাত্মক প্রবাহেরই একটি অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। অ্যাকাউন্টের পোস্টগুলিতে নিজেদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে রসিকতার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন নীতি ও রাজনৈতিক ঘটনাকে ব্যঙ্গ করা হয়।
পেজটির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই ফলোয়ারের সংখ্যা কয়েক লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে যায় বলে দাবি করা হয়। তবে সমাজমাধ্যমের ফলোয়ার সংখ্যা দ্রুত বদলাতে পারে এবং অ্যাকাউন্টটি এখন সক্রিয় না থাকায় সেই সংখ্যাকে স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
অ্যাকাউন্টটি কিছু সময়ের জন্য ইনস্টাগ্রাম থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় নতুন করে জল্পনা শুরু হয়। ব্যবহারকারীরা পেজটি খোলার চেষ্টা করলে অ্যাকাউন্টটি পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে আবার সেটি ফিরে আসে বলে দাবি করা হয়। পেজটির পক্ষ থেকে এক্স (X)-এ সাইবার হামলার অভিযোগও তোলা হয়েছিল। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
শুধু ইনস্টাগ্রামেই নয়, এক্সেও একই নামে একটি অ্যাকাউন্ট সক্রিয় ছিল। সেখানে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে পোস্ট করা হয়। অ্যাকাউন্টগুলির বায়োতেও ব্যঙ্গাত্মক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। নিজেদের মূলমন্ত্র হিসেবে ‘ভাবুন, গবেষণা করুন, প্রতিরোধ করুন’ ধরনের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
পেজটির পোস্টে স্বাধীনতা সংগ্রামী ভগৎ সিংহের (Bhagat Singh) নামও উঠে এসেছে। নিজেদের তাঁর আদর্শের অনুসারী বলে দাবি করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এই ধরনের দাবি সম্পূর্ণ ভাবে সংশ্লিষ্ট সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টের নিজস্ব বক্তব্য; এর সঙ্গে কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধটি নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও তীব্র হয়েছে। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম (P. Chidambaram) ব্যঙ্গ করে নিজেকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলে উল্লেখ করেছেন। কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশ (Jairam Ramesh)-ও প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আগে ‘আরবান নকশাল’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হত, এখন তার জায়গায় নতুন শব্দবন্ধ এসেছে।
বিজেপির তরফে অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানা হয়নি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু (Kiren Rijiju) দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী নেতাদের উদ্দেশে ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। তাঁর ব্যাখ্যায়, মাওবাদী মতাদর্শকে সমর্থন করেন বা দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর বিরোধিতা করেন—এমন মতাদর্শগত সমর্থকদের উদ্দেশেই প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ছিল।
এই বিতর্কের আবহেই সমাজমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পেজ তৈরির প্রবণতা ফের নজরে এসেছে। এর আগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামেও একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন সমাজমাধ্যমে আলোচনায় এসেছিল। নতুন ‘দিমাগি নকশাল জনতা পার্টি’ সেই ধারারই আরও একটি উদাহরণ কি না, তা সময়ই বলবে।
তবে এটুকু স্পষ্ট, রাজনৈতিক ভাষ্য এখন শুধু সভা, মিছিল বা সংবাদমাধ্যমের মধ্যে আটকে নেই। সমাজমাধ্যমের নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক শব্দবন্ধকে দ্রুত মিম, ব্যঙ্গ এবং ডিজিটাল প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করছে। ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই পেজও সেই পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই একটি নজরকাড়া উদাহরণ হয়ে উঠেছে।



