প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর শিল্পনীতির প্রশংসা করলেন রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। বৃহস্পতিবার সকালে কলকাতার ইকো পার্কে প্রাতঃভ্রমণের সময় শিল্পায়ন থেকে সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ—একাধিক বিষয়ে মুখ খোলেন তিনি। তাঁর দাবি, পুজোর আগেই সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ সম্পূর্ণ হতে পারে।
কলকাতায় থাকলে প্রতিদিনের মতো এদিনও ইকো পার্কে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন দিলীপ ঘোষ। সেখানেই বাংলায় শিল্প বিনিয়োগ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানির (Gautam Adani) বঙ্গ সফরের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, এর আগে শিল্প সম্মেলনে এলেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ হয়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের বড় শিল্পপতিরা বাংলায় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
দিলীপ বলেন, শিল্পের জন্য জমি ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোগত সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের তরফে আলোচনা চলছে। তাঁর কথায়, ব্যক্তিগত স্তরেও শিল্পপতিদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা বাংলায় আসছেন। আগামী দিনে আরও শিল্পগোষ্ঠী রাজ্যে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এই প্রসঙ্গেই বাম আমলের শিল্পনীতির কথা ওঠে। জ্যোতি বসুর (Jyoti Basu) শিল্পনীতির প্রশংসা করে দিলীপের বক্তব্য, সেই সময় শিল্পায়নের জন্য যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার গুরুত্ব ছিল। তবে একই সঙ্গে সিপিএমের (CPI(M)) অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে দলের রাজনৈতিক পতনের অন্যতম কারণ বলে দাবি করেন তিনি।
জ্যোতি বসুকে ঘিরে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রসঙ্গও। দিলীপের দাবি, জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলেও দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের কারণে তা সম্ভব হয়নি। সেই ঘটনাকে সিপিএমের পরবর্তী রাজনৈতিক অবক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন তিনি। এটি অবশ্য দিলীপ ঘোষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; দলের পতনের কারণ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ রয়েছে।
রাজ্যে শিল্পের জন্য জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন দিলীপ। তাঁর বক্তব্য, শিল্পের নামে জমি নিয়ে সেখানে প্রকল্প তৈরি না করলে সেই জমি ফেরত নেওয়ার জন্য নোটিস দেওয়া হবে। অন্যদিকে নতুন করে শিল্পের জন্য জমি নেওয়া সংস্থাগুলিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পের জমি ও বিনিয়োগ নিয়ে রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণাতেও একই ধরনের সময়সীমার কথা সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জানিয়েছেন, পুজোর আগে নতুন শিল্পনীতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই নীতিতে সরাসরি জমি কেনা, ল্যান্ড পুলিং এবং সিঙ্গল-উইন্ডো ব্যবস্থার মতো বিষয় রাখা হচ্ছে।
বুধবার কলকাতার মিলন মেলা প্রাঙ্গণে ৩৩টি শিল্প প্রকল্পকে জমি বরাদ্দের চিঠি দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলিতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।
এদিন সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ নিয়েও বড় দাবি করেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, বাম আমলের বকেয়া ডিএ মেটানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ১৫ অক্টোবর অগ্রিম বেতন দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। কর্মীরা তাঁদের প্রাপ্য পাওয়ার অধিকারী—এই অবস্থান জানিয়ে সরকারি কর্মীদের কাজের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
বকেয়া ডিএ নিয়ে দিলীপের বক্তব্য, সরকারের সেই বকেয়া মেটানোর আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে কথা দিয়েছেন। তাঁর আশা, দুর্গাপুজোর আগেই বকেয়া সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে পারে। তবে বকেয়া ডিএ মেটানোর নির্দিষ্ট অঙ্ক, সময়সূচি ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত তথ্য তাঁর এই বক্তব্যে আলাদা করে জানানো হয়নি।
একদিকে শিল্পায়নের জন্য নতুন জমি নীতি ও বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ, অন্যদিকে সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ—দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই এদিন সরকারের অবস্থান তুলে ধরলেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর মন্তব্যে একইসঙ্গে উঠে এল জ্যোতি বসুর শিল্পনীতি নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন এবং সিপিএমের রাজনৈতিক পতন নিয়ে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যাও।



