সুগার আর ডায়াবিটিস কি একই? অনেকেই করেন এই ভুল, জানুন চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা

রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলেই ডায়াবিটিস হয় না। ব্লাড সুগার ও ডায়াবিটিসের পার্থক্য, কারণ, ঝুঁকি এবং সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার বৈজ্ঞানিক উপায় জানালেন বিশেষজ্ঞরা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

‘সুগার হয়েছে’— কথাটা আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু ব্লাড সুগার (Blood Sugar) বেড়ে যাওয়া আর ডায়াবিটিস (Diabetes) হওয়া এক বিষয় নয়। চিকিৎসকদের মতে, ব্লাড সুগার হলো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, আর ডায়াবিটিস হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে শরীর সেই গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে।

অনেকেই রক্ত পরীক্ষায় সুগারের মাত্রা একটু বেশি দেখলেই ধরে নেন তিনি ডায়াবিটিসে আক্রান্ত। আবার কেউ কেউ ‘সুগার’ এবং ‘ডায়াবিটিস’ শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণা ঠিক নয়। কারণ, ব্লাড সুগার একটি শারীরবৃত্তীয় পরিমাপ, অন্যদিকে ডায়াবিটিস একটি নির্দিষ্ট রোগ, যার নির্ণয়ের জন্য একাধিক পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

ব্লাড সুগার আসলে কী?

ব্লাড সুগার বা রক্তে গ্লুকোজ হলো শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। আমরা যে খাবার খাই, বিশেষ করে কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার, তা ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি হয় এবং রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে যায়।

একজন সুস্থ মানুষের শরীরেও ব্লাড সুগার থাকে এবং তা স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যেই ওঠানামা করে। খাবার খাওয়ার পরে সাময়িকভাবে সুগার বাড়তে পারে, আবার ব্যায়াম, শারীরিক পরিশ্রম বা দীর্ঘ সময় না খেলে তা কমতেও পারে। মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব বা অসুস্থতার কারণেও সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

ডায়াবিটিস কীভাবে হয়?

ডায়াবিটিস এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন (Insulin) তৈরি করতে পারে না অথবা উৎপাদিত ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়। ইনসুলিন হলো অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে নিঃসৃত একটি হরমোন, যা রক্তের গ্লুকোজকে কোষে পৌঁছে শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে।

যখন এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হয়, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। এই অবস্থাই ডায়াবিটিসের ঝুঁকি তৈরি করে এবং চিকিৎসা না হলে ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে।

একদিন সুগার বেশি এলেই কি ডায়াবিটিস?

না। চিকিৎসকদের মতে, কোনও একটি পরীক্ষায় রক্তে সুগারের মাত্রা বেশি এলেই কাউকে ডায়াবিটিস রোগী বলা যায় না। কারণ সাময়িক মানসিক চাপ, সংক্রমণ, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, অস্ত্রোপচার, স্টেরয়েডের মতো কিছু ওষুধ বা অন্য শারীরিক সমস্যার কারণেও অস্থায়ীভাবে সুগার বেড়ে যেতে পারে।

তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুনরায় পরীক্ষা, ফাস্টিং ব্লাড সুগার, পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল ব্লাড সুগার এবং এইচবিএওয়ানসি (HbA1c)-সহ অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া হয় ডায়াবিটিস আছে কি না।

কেন নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি?

ডায়াবিটিসকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে বেশিরভাগ মানুষের কোনও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। কিন্তু দীর্ঘদিন রক্তে সুগারের মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্‌রোগ, কিডনির সমস্যা, চোখের রেটিনার ক্ষতি, স্নায়ুর জটিলতা এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, নির্দিষ্ট বয়সের পর বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। দ্রুত রোগ ধরা পড়লে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার সহজ উপায়

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই ডায়াবিটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সুষম খাদ্য গ্রহণ, অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কম খাওয়া, ফাইবার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ বা ঘরোয়া উপায় ব্যবহার না করাই ভালো।

মনে রাখতে হবে, ব্লাড সুগার এবং ডায়াবিটিস এক নয়। রক্তে সুগারের মাত্রা একটি স্বাস্থ্য সূচক, আর ডায়াবিটিস একটি রোগ। তাই কোনও পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন