তবে কি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়ার মুখে?

তবে কি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়ার মুখে?

সম্রাট গুপ্ত: তবে কি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়ার মুখে? মোট আক্রান্তের  বিচারে ১৩ জুলাইয়ের হিসেবে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে চতুর্থ জনবহুল ও দ্বিতীয় ঘনবসতিপূর্ণ পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান অষ্টম। দিল্লিতে প্রতিলাখে করোনা আক্রান্ত ৫৫১৫, মহারাষ্ট্রে ২০০২, তামিলনাড়ুতে ১৭৬৬, তেলেঙ্গানায় ৮৯১, গুজরাটে ৫৯৫, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে সেই সংখ্যাটা মাত্র ২৯২। মহারাষ্ট্রে যেখানে মোট করোনা পরীক্ষাকৃত মানুষের ১৯.৩ শতাংশ মানুষ করোনা‌ আক্রান্ত হচ্ছেন,সেখানে পশ্চিমবঙ্গে সেই হার মাত্র ৫.০১ শতাংশ।

আরও পড়ুনঃ চার জেলা আশঙ্কাজনক, করোনা রুখতে নোডাল অফিসার নিয়োগ করল নবান্ন!

জনসংখ্যার বিচারে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কোলকাতা করোনা আক্রান্তের সংখ্যার বিচারে যথাক্রমে দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই,থানে,পুণে, হায়দ্রাবাদ, আমেদাবাদ, ব্যাঙ্গালোরের পরে নবম।পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থদপ্তরের ওয়েবসাইট দেখাচ্ছে সরকারি ও সরকার গৃহীত হাসপাতালে ৭৭২০ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৩০২ টি বেড , অর্থাৎ মোট  ১০৮৬২ টি নির্ধারিত কোভিড বেডের মধ্যে ৮০৭২ টিই ফাঁকা(১৩ তারিখের বুলেটিন অনুযায়ী)।তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কেন পশ্চিমবঙ্গবাসীকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হচ্ছে? কেন আমাদের দেখতে হচ্ছে একেরপর এক হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেয়ে মৃত্যুর ঘটনা?

তবে কি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়ার মুখে? কেন? প্রথমে আসি মোট কোভিড বেড এবং হাসপাতাল সংখ্যার প্রসঙ্গে। সরকারি ২৬ এবং বেসরকারি ৫৪ হাসপাতালকে আপাতত চিহ্নিত করা হয়েছে কোভিড চিকিৎসায় জন্য। কিন্তু স্বাস্থ্য দপ্তরের খালি বেডের নিয়মিত বুলেটিনটা দেখলেই দেখবেন বেশ কিছু হাসপাতালে একজন রুগিও ভর্তি নেই। খোঁজ নিলে জানতে পারবেন তালিকায় থাকা এইরকম একাধিক হাসপাতাল সরকারি নির্দেশ সত্ত্বেও নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে কোন করোনা আক্রান্তকে ভর্তি নিচ্ছেনা।অন্য হাসপাতালে রেফার করে দায় সারছে। অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে নির্ধারিত বেডের অনেক কম বেডে মিলছে চিকিৎসা। কোথাও কোথাও নেতা, মন্ত্রীদের সংরক্ষিত  কোটা বেডের অস্তিত্বের কথা শোনা যাচ্ছে।আগে বেশ কিছু জায়গায় ঘুষের মাধ্যমে এই সরকারি পরিষেবা বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। আবার করোনা সন্দেহ করা হচ্ছে এমন রুগি ভর্তির ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি। কিছু কিছু কোভিড হাসপাতাল যেমন নিশ্চিত করোনা রুগি নাহলে ভর্তি নিতে চাইছেনা, তেমন আবার  কারো কারো ক্ষেত্রে সব পরীক্ষা করে চিকিৎসা শুরু করতে কখনো কয়েকদিন পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চলছেই।

এবার আমরা একটা পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখি। জুন ২৪ থেকে জুলাই ১২ এই সময়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার ,অর্থাৎ  দ্বিগুণ। কিন্তু ওই একই সময়সীমার মধ্যে মহারাষ্ট্রে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৪২ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৪ হাজার হয়েছে এবং দিল্লিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার হয়েছে, অর্থাৎ শেষ কিছু সপ্তাহে মারাত্মকভাবে করোনা বিধ্বস্ত মহারাষ্ট্র, দিল্লি থেকে পশ্চিমবঙ্গে সংক্রমণের হার অধিক।১৩ ই জুলাই এর হিসাব অনুযায়ী ভারতের মোট করোনা পরীক্ষার সংখ্যা ১১৮০৬২৫৬ ও প্রতিলাখে ৮৫৫৩ এবং পশ্চিমবঙ্গের মোট টেস্ট ৬২৭৪৩ ও প্রতিলাখে ৬৯৭২। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে করোনা পরীক্ষার হার দেশের গড় করোনা পরীক্ষাহারের থেকে অনেক কম।

যেখানে কিছুদিন আগের হিসাব অনুযায়ী প্রতিলাখে করোনা পরীক্ষার হার মহারাষ্ট্রে ১১০১২, তামিলনাড়ুতে ২১৮৫১, দিল্লিতে ৩৯৮৬৩, অন্ধ্রপ্রদেশে ২২৪৬৪, জন্মু কাশ্মীরে ৩৪৮১৮, আসামে ১৬১০৮, কর্নাটকে ১৩০১২, রাজস্থানে ১৩৬৪৩, হরিয়ানাতে ১৩৩০৩, পাঞ্জাবে ১৩২৩৫, কেরালাতে ১১৮৫১, ছত্তিশগড়ে ৭৪২৯, গুজরাটে ৬৯২২, পশ্চিমবঙ্গে ৬৪৭৫,মধ্যপ্রদেশে ৬১৯৩, উড়িষ্যাতে ৭৮২১, ঝাড়খন্ডে ৪৯৩৭, উত্তরপ্রদেশে ৪৯২৯, এবং বিহারে ২৬৭০ ছিল। ১৩ তারিখের হিসেবে মোটামুটি ১৭লাখ ,১৩ ,১২ লাখ করোনা পরীক্ষা করে রাজ্যগুলির মধ্যে মোট করোনা পরীক্ষার সংখ্যায় তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র এবং অন্ধ্রপ্রদেশে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়। সেখানে মাত্র ৬.২৭ লাখ টেস্ট করে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান অষ্টম।

কিছুদিন‌ আগে রাজ্যের সেফ হাউসের সিদ্ধান্ত অন্যরাজ্যের কাছে প্রশংসা পেয়েছে। আবার একইসঙ্গে ১৮ বছরের তরুণ শুভ্রজিৎ কিংবা ২৬শের যুবক অশোক রুইদাসের হাসপাতালের দরজায় দরজায় ঘুরে মৃত্যুর খবরে মানুষের ক্ষোভ বৃদ্ধি করছে। শাসক নিজেও হয়তো জানেন সাধারণ মানুষ দিনের শেষে নিজের স্বার্থটুকু বজায় রাখতে পারলেই সে পরিতৃপ্ত। মানুষ এখন ভীত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়।তাই শাসককে যদি তার গদি বাঁচাতে হয় এই সামান্যটুকু পরিষেবা তাকে নিশ্চিত করতে হবে । এই পরিস্থিতি থেকে কবে আমরা মুক্তি পাবো কেউ জানেনা, কিন্তু সরকারের এই পদক্ষেপগুলো আমাদের সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট রাখবে নিশ্চিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x