বাংলায় বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণের মাত্র ৫২ ঘণ্টা আগে মধ্যমগ্রামে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে খুন হলেন শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। আর এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে ক্রমশ জোরালো হচ্ছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তত্ত্ব। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত হামলা। শুধু চন্দ্রনাথকে টার্গেট করা হয়েছিল, নাকি শুভেন্দু অধিকারীকেই নিশানা করতে চেয়েছিল দুষ্কৃতীরা— সেই প্রশ্নও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তে। একাধিক বাইক, সন্দেহজনক গাড়ি এবং আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের তথ্য সামনে আসতেই রহস্য আরও গভীর হয়েছে।
বুধবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ উত্তর ২৪ পরগনার দোহাড়িয়া এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বোর্ড লাগানো সাদা স্করপিও গাড়িতে কলকাতা থেকে মধ্যমগ্রামের ফ্ল্যাটে ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ রথ। গাড়ি চালাচ্ছিলেন বুদ্ধদেব বেরা। পুলিশ সূত্রে খবর, মাঝরাস্তায় প্রথমে একটি সন্দেহজনক গাড়ি তাঁদের পথ আটকায়। এরপর চারটি মোটরবাইকে অন্তত আট জন দুষ্কৃতী এসে স্করপিও লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায়।


স্থানীয়দের দাবি, হামলাকারীদের মাথায় হেলমেট ছিল এবং বাইকের নম্বর প্লেট ঢাকা ছিল। গোটা অপারেশনটি অত্যন্ত পেশাদারি কায়দায় চালানো হয়েছে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেবকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা চন্দ্রনাথকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর জখম অবস্থায় চিকিৎসাধীন বুদ্ধদেব।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, চন্দ্রনাথের বুকের বাঁ দিকে অন্তত দু’টি গুলি লাগে। অন্যদিকে বুদ্ধদেবের শরীরে তিনটি গুলি পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে তদন্তকারীদের অনুমান, ৬ থেকে ১০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল।
তদন্তে উঠে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। পুলিশের দাবি, হামলায় সম্ভবত ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক ‘গ্লক ৪৭এক্স’ পিস্তল। এই ধরনের অস্ত্র সাধারণ অপরাধীদের হাতে সচরাচর দেখা যায় না। ফলে এর পিছনে বড় অপরাধচক্র বা প্রশিক্ষিত শুটার জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।


রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা জানিয়েছেন, যে গাড়িটি চন্দ্রনাথদের স্করপিওর রাস্তা আটকে দিয়েছিল, সেটি ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তবে সেই গাড়ির নম্বর প্লেটটি নকল। নম্বর অনুযায়ী গাড়িটি শিলিগুড়ির বলে দেখালেও তদন্তে জানা গিয়েছে, সেটি ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করছিল। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোল ও তাজা কার্তুজও উদ্ধার হয়েছে।
ঘটনার পর রাতেই এলাকায় পৌঁছে যান শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, “দুই-তিন দিন ধরে রেইকি করে ঠান্ডা মাথায় এই খুন করা হয়েছে।” শুভেন্দুর ভাই দিব্যেন্দু অধিকারীও দাবি করেছেন, অনেকক্ষণ ধরেই শুটাররা চন্দ্রনাথের গাড়িকে অনুসরণ করছিল।
এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সরাসরি তৃণমূলকে নিশানা করেছেন। যদিও তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনায় আদালতের নজরদারিতে সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছে। দলের বক্তব্য, রাজনৈতিক হিংসার কোনও জায়গা গণতন্ত্রে নেই এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মধ্যমগ্রামে উত্তেজনা ছড়ায়। বিজেপি সমর্থকেরা যশোর রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।
চন্দ্রনাথ রথ দীর্ঘদিন ধরে শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ভারতীয় বায়ুসেনার প্রাক্তন জওয়ান চন্দ্রনাথ পরে শুভেন্দুর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব সামলাতেন। ফলে তাঁর হত্যাকাণ্ড রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে গভীর নাড়া দিয়েছে।







