নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা CAA (Citizenship Amendment Act) কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় বড় প্রশাসনিক বদল আনল কেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গ-সহ নির্দিষ্ট রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে Section 6B-এর আওতায় নাগরিকত্বের আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা এবার জেলা শাসকদের দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে এতদিন যে প্রক্রিয়া Empowered Committee ও District-Level Committee-র মাধ্যমে চলছিল, নির্দিষ্ট এলাকায় তা আরও স্থানীয় স্তরে দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হল।
CAA-র আওতায় নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট যোগ্য আবেদনকারীরা। ২০২৪ সালের সংশোধিত Citizenship Rules-এ Section 6B-এর আবেদন গ্রহণ, নথি যাচাই এবং Empowered Committee-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিস্তারিত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নতুন ব্যবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি পঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাত, অসম ও ত্রিপুরার নির্দিষ্ট এলাকা এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর ও লাদাখেও জেলা প্রশাসনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্দিষ্ট এলাকা এবং আদিবাসী এলাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।
কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে CAA-র আবেদনের নিষ্পত্তি আরও দ্রুত করা। পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গে CAA-র আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য একটি State-Level Empowered Committee গঠন করেছিল।
Section 6B-এর অধীনে আবেদনকারীর নথিপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁর যোগ্যতা এবং আইনের নির্ধারিত শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়। ২০২৪ সালের নিয়ম অনুযায়ী আবেদন প্রথমে District Level Committee-র মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ হয়ে Empowered Committee-র কাছে যায়। আবেদনকারীকে ‘fit and proper person’ হিসেবে বিবেচনা করার পরই নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
CAA-র ক্ষেত্রে শুধু ধর্মীয় পরিচয় থাকলেই নাগরিকত্ব নিশ্চিত হয় না। আবেদনকারীকে আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। আবেদনপত্রের সঙ্গে নির্দিষ্ট নথিও জমা দিতে হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে Citizenship Rules-এর Schedule 1C-তেও পরিবর্তন এনে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের বৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের তথ্য জমা দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
এতদিন CAA-র আবেদন নিষ্পত্তির মূল দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রের নির্ধারিত Empowered Committee-র হাতে। District Level Committee আবেদনকারীর নথি যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আবেদনটি পরবর্তী স্তরে পাঠাত। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অঞ্চলে জেলা শাসকদের হাতে নিষ্পত্তির ক্ষমতা যাওয়ায় প্রশাসনিক স্তর কমবে এবং প্রক্রিয়াটি দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তৃণমূল সরকারের সময়ে CAA-র বিরোধিতা করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকার গঠনের পর থেকেই যোগ্য আবেদনকারীদের CAA-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
১ অগস্ট নিউটাউনের একটি কর্মসূচিতে ৩০০ আবেদনকারীর হাতে CAA-র নাগরিকত্বের শংসাপত্র তুলে দেওয়ার দাবি করেছিলেন শুভেন্দু। সেই অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, CAA নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, দেওয়ার জন্য। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাজ্যের হাতে আবেদন নিষ্পত্তির বিষয়টি দ্রুত আনার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
এ বার কেন্দ্রের নতুন প্রশাসনিক পদক্ষেপে সেই প্রক্রিয়াতেই গতি আসতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা Section 6B-এর আবেদনগুলি দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হলে CAA-র বাস্তবায়ন আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।
তবে নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদনগুলি কী ভাবে হস্তান্তর করা হয় এবং যাচাই-বাছাই কত দ্রুত সম্পন্ন হয় তার উপর। সংশ্লিষ্ট Empowered Committee ও District-Level Committee-র কাছে থাকা মুলতবি আবেদনগুলির ক্ষেত্রেও নতুন ব্যবস্থায় কী ভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। CAA-র আবেদন নিষ্পত্তিতে কেন্দ্রের এই বিকেন্দ্রীকরণ পশ্চিমবঙ্গ-সহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।



