যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার ও বৃহস্পতিবারের অশান্তির ঘটনায় এবার আনুষ্ঠানিক ভাবে তদন্তে নামল কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকের পর যাদবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বহিরাগত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে থাকা সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার দুপুরে ই-মেলের মাধ্যমে যাদবপুর থানায় অভিযোগ পাঠানো হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে খবর। রেজিস্ট্রার সেলিমবক্স মণ্ডল জানিয়েছেন, উপাচার্যের নির্দেশেই তদন্ত কমিটি তৈরি করা হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, কী ভাবে অশান্তির সূত্রপাত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে কী কী ঘটনা ঘটেছে—সবই খতিয়ে দেখা হবে।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিতে বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত কোনও ব্যক্তিকে রাখা হচ্ছে না বলেই সূত্রের খবর। কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন উপাচার্য, কলকাতার অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য এবং অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের IQAC বিভাগের অধিকর্তাকে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁরা সমস্ত পক্ষের বক্তব্য ও তথ্য পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট জমা দেবেন বলে জানা গিয়েছে।
শিক্ষক ও পড়ুয়াদের দাবির পরেই থানায় লিখিত অভিযোগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। অভিযোগপত্রে বহিরাগতদের বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ, ভাঙচুর এবং ঐতিহ্যবাহী ভবনের সামনে আগুন জ্বালানোর মতো অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। তদন্তে সহায়তার জন্য ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে বুধবার রাতের ঘটনা এবং বৃহস্পতিবারের অশান্তির প্রতিবাদে শিক্ষক মহলেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম বা গৌরবচিহ্ন ভাঙার অভিযোগের প্রতিবাদে শুক্রবার দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত অর্ধদিবস কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। অরবিন্দ ভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভও করছেন শিক্ষকরা। বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষকদের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার রাতে অরবিন্দ ভবনে একটি জেনারেল বডি বৈঠককে কেন্দ্র করে। এরপর বৃহস্পতিবারও ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়ায়। দুই পক্ষের জমায়েত ও মিছিলকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের কাছে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতীক ভেঙে পড়ার ঘটনা সামনে আসে।
অভিযোগ, বৃহস্পতিবার দুপুরে এবিভিপি (ABVP)-র সমর্থকেরা ৪ নম্বর গেটের সামনে জমায়েত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। গেট বন্ধ থাকায় নন্দলাল বসুর নকশা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকের উপর পা দিয়ে উঠে গেট পার হওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ। সেই সময় প্রতীকের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। পরে ওই বৃত্তাকার ধাতব অংশটি ক্যাম্পাসের ভিতরে ছুড়ে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে প্রতীক ভাঙার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে এবিভিপি। শুক্রবার সংগঠনের তরফে পাল্টা দাবি করা হয়েছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ফলক ভাঙার ঘটনা ‘অতিবাম’ বা নকশালপন্থীদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ফলকে পদ্মফুলের পাপড়ির নকশা থাকায় সেটিকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভাঙা হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
এবিভিপি আরও অভিযোগ করেছে, এই ঘটনার সঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রাজ্যেশ্বর সিংহের যোগ রয়েছে। সংগঠনের দাবি, ফলক ভাঙার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তারা আন্দোলনে নামবে। তবে এবিভিপির এই অভিযোগেরও স্বাধীন ভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের জবাবে রাজ্যেশ্বর সিংহ জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই প্রতীকটি কী ভাবে ভেঙেছে, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় তিনি ক্যাম্পাসের ভিতরে ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকটি ছিল বাইরের দিকে। তিনি এই ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অশান্তিকে ঘিরে এখন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পর্ব চলছে। কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ, তিন সদস্যের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি এবং পুলিশের হাতে সিসিটিভি ফুটেজ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে তদন্তের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হল। এখন সেই ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের ভূমিকা কতটা ছিল, সেটাই সামনে আসার অপেক্ষা।



