এসআইআর নিয়ে যেই চাপ তৃণমূলকে কোণঠাসা করবে বলে বিজেপির অন্দরে আশা ছিল, সেই ইস্যুই উল্টে গড় এলাকাগুলিতে অস্বস্তি বাড়িয়েছে গেরুয়া শিবিরের। মতুয়া ও রাজবংশী অধ্যুষিত অঞ্চলে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত আশঙ্কা ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সেই প্রেক্ষাপটে বিজেপি ভরসা রাখল তরুণ ব্রিগেডের উপর। যুবমোর্চার নতুন রাজ্য কমিটিতে এক-চতুর্থাংশ সদস্যই এসেছেন মতুয়া, নমশূদ্র ও রাজবংশী প্রধান এলাকা থেকে—যা স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
রবিবার ঘোষণা হয়েছে বিজেপি যুবমোর্চার নতুন রাজ্য কমিটি। তালিকা খতিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে, আট জন সহ-সভাপতির মধ্যে চার জনই দক্ষিণবঙ্গের মতুয়াবহুল বা উত্তরবঙ্গের রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকা থেকে উঠে আসা মুখ। তিন সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে একজন এমন এক বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যাকে ‘মতুয়াদুর্গ’ বলে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি আরও অন্তত দুই পদাধিকারী রয়েছেন মতুয়া বা নমশূদ্র সমাজ থেকে।


বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার প্রভাবশালী তরুণ নেতা গোপাল গয়ালি—মতুয়া সমাজের পরিচিত মুখ—হয়েছেন যুবমোর্চার রাজ্য সহ-সভাপতি। এক সময়ে রাজ্য বিজেপির সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ সহায়ক ছিলেন গোপাল, পরে জেলা বিজেপির সম্পাদক হন। সিএএ-কে সামনে রেখে মতুয়া এলাকায় সহায়তা শিবির গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয় ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। সেই সংগঠককেই এ বার রাজ্য স্তরে তুলে আনা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের কোচবিহার থেকে উঠে আসা সমীর রায়—রাজবংশী তরুণ মুখ—আবারও সহ-সভাপতি পদে বহাল রয়েছেন। দলীয় কর্মসূচি, মিছিল-মিটিং থেকে শুরু করে ভোটের দিনে মাঠে থাকা—সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় সমীর সংগঠনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মুখ বলেই পরিচিত। যুবমোর্চার বিদায়ী কমিটিতেও তিনি একই পদে ছিলেন।
তিন সাধারণ সম্পাদকের অন্যতম আশিস বিশ্বাস কৃষ্ণগঞ্জের যুবনেতা। কৃষ্ণগঞ্জ ও রানাঘাট—মতুয়া প্রভাবিত অঞ্চল—গত কয়েকটি নির্বাচনে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু এসআইআর ইস্যুতে মতুয়া-নমশূদ্র সমাজের একাংশে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ রয়েছে। সেই পটভূমিতে আশিসকে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক করে যুবভিত্তি ধরে রাখার বার্তা দিচ্ছে বিজেপি বলেই রাজনৈতিক মহলের অনুমান।


ব্যারাকপুরের যুব নেতা উত্তম অধিকারী ও জলপাইগুড়ির এবিভিপি-ঘনিষ্ঠ সপ্তর্ষি সরকারকেও সহ-সভাপতি করা হয়েছে। ব্যারাকপুরে রয়েছে বিপুল মতুয়া ভোটার, জলপাইগুড়িতে উল্লেখযোগ্য রাজবংশী জনসমাজ—এই দুই ক্ষেত্রেই তরুণ নেতৃত্বকে সামনে এনে সংগঠন মজবুত করার চেষ্টা স্পষ্ট।
গাইঘাটার অচিন্ত্য মণ্ডল—যিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউ-তে এবিভিপির হয়ে কাজ করেছেন—তাঁকে যুগ্ম মিডিয়া ইনচার্জ করা হয়েছে। তিনি নমশূদ্র সম্প্রদায়ের। বনগাঁ-বারাসত অঞ্চলে সক্রিয় মতুয়া তরুণী প্রিয়ন্তী রায়কে যুগ্ম অফিস সম্পাদক পদ দেওয়া হলেও তিনি সমাজমাধ্যমে জানিয়েছেন, এই দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করছেন না। বৃহত্তর ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন বলেই ঘনিষ্ঠ মহলে ইঙ্গিত।
যদিও যুবমোর্চার রাজ্য নেতৃত্ব প্রকাশ্যে ‘ভোটের সমীকরণ’-এর অভিযোগ মানতে নারাজ। সদ্যনিযুক্ত সহ-সভাপতি গোপাল গয়ালির দাবি, বিজেপি সর্বস্পর্শী রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং আগেও মতুয়া, নমশূদ্র, রাজবংশী প্রতিনিধিত্ব ছিল, এখনও আছে—এ বার তা আরও শক্তিশালী হয়েছে মাত্র।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসআইআর ঘিরে তৈরি হওয়া উদ্বেগের আবহে গড় এলাকায় সাংগঠনিক বার্তা দেওয়াই এই রদবদলের মূল লক্ষ্য।








