বিহার-মধ্যপ্রদেশে হার বিজেপির, গুজরাতে মার্জিন কমল ৭০ হাজার! অশনি সংকেত?

বাঁকিপুরে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি ভেঙে জয় প্রশান্ত কিশোরের, দাতিয়ায় কংগ্রেসের দখল বজায়। গুজরাটে জিতেও ১ লক্ষ থেকে ৩০ হাজারে নেমে এল বিজেপির জয়ের ব্যবধান।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা, সম্পাদক (নজরবন্দি.ইন): ভারতের রাজনীতিতে উপনির্বাচনের ফল সবসময় সরকার বদলের পূর্বাভাস দেয় না। কিন্তু অনেক সময় এই ফলই ভোটারদের মনের পরিবর্তনের প্রথম ইঙ্গিত হয়ে ওঠে। সোমবার প্রকাশিত বিহার, মধ্যপ্রদেশ এবং গুজরাটের তিনটি বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলও তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। সংখ্যার বিচারে বিজেপি (Bharatiya Janata Party) তিনটির মধ্যে একটি আসন ধরে রাখতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু ভোটের অঙ্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে— তিন রাজ্যেই গেরুয়া শিবিরের সামনে নতুন প্রশ্ন উঠে এসেছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা নিঃসন্দেহে বিহারের বাঁকিপুর (Bankipur)। এই আসনটি শুধু একটি সাধারণ বিধানসভা কেন্দ্র নয়, এটি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন (Nitin Nabin)-এর রাজনৈতিক ঘাঁটি। ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি এখানে প্রায় ৫২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই একই আসনে বিজেপি প্রায় ১৯,৩২৪ ভোটে পরাজিত। অর্থাৎ কার্যত প্রায় ৭১ হাজার ভোটের সুইং দেখা গেল। রাজনীতির ভাষায় এটি শুধুমাত্র একটি আসন হার নয়, ভোটারদের মনোভাবের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই জয় এসেছে জন সুরাজ পার্টির (Jan Suraaj Party) প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor)-এর হাত ধরে। দীর্ঘদিন নির্বাচনী কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত প্রশান্ত কিশোর এবার নিজের রাজনৈতিক দলের হয়ে সরাসরি লড়ে বিজেপির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আসন দখল করলেন। বিহারের রাজনীতিতে এর প্রভাব আগামী বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া (Datia) ফলও বিজেপির জন্য খুব স্বস্তিদায়ক নয়। এখানে কংগ্রেস (Indian National Congress) নিজেদের দখল বজায় রেখেছে। যদিও ২০২৩ সালের তুলনায় কংগ্রেসের জয়ের ব্যবধান কিছুটা কমেছে— ৭,৭৪২ থেকে ৬,০১৬ ভোটে নেমেছে। তবুও বিজেপি আসনটি ছিনিয়ে আনতে পারেনি। অর্থাৎ বিরোধী শিবিরের ঘাঁটিতে এখনও প্রত্যাশিত সাফল্য অধরাই রয়ে গেল গেরুয়া শিবিরের।

সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে গুজরাটের মঞ্জলপুর (Manjalpur)। উপরিভাগে দেখলে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়। কিন্তু ভোটের অঙ্ক অন্য গল্প বলছে। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল ১,০০,৭৫৪ ভোট। ২০২৬ সালের উপনির্বাচনে সেই ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে ৩০,৬৩০ ভোটে। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের মধ্যে জয়ের মার্জিন কমেছে প্রায় ৭০ হাজার ভোট। বিজেপি আসন ধরে রাখলেও ভোটের ব্যবধানের এই বড় পতনকে রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করা কঠিন।

অবশ্য এই ফলকে সরাসরি জাতীয় রাজনীতির চূড়ান্ত নির্দেশক বলাও ঠিক হবে না। উপনির্বাচনের ভোটে স্থানীয় সমীকরণ, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটদানের হার— সবকিছুরই বড় প্রভাব থাকে। ফলে এই ফলকে লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তবুও তিনটি ফল একসঙ্গে রেখে বিচার করলে একটি প্রবণতা স্পষ্ট। বিজেপি এখনও শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে গুজরাটে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে, কিন্তু আগের মতো বিপুল ব্যবধানের নিশ্চিন্ত অবস্থানে নেই। অন্যদিকে বিহারে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের ঘাঁটি অক্ষুণ্ণ থাকা বিরোধী রাজনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা।

রাজনীতিতে অনেক সময় আসনের সংখ্যা নয়, ভোটের ব্যবধানই ভবিষ্যতের গল্প বলে। বাঁকিপুরে বিজেপির ৫২ হাজার ভোটের জয় এক বছরে ১৯ হাজার ভোটের পরাজয়ে বদলে যাওয়া এবং মঞ্জলপুরে ১ লক্ষের বেশি ব্যবধান নেমে ৩০ হাজারে পৌঁছে যাওয়া— এই দুই পরিসংখ্যানই আগামী কয়েক মাসে রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হতে পারে।

এই কারণেই তিনটি উপনির্বাচনের ফলকে শুধু জয়-পরাজয়ের অঙ্কে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন। বিজেপি এখনও জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলেও, এই ফলাফল অন্তত এটুকু ইঙ্গিত দিচ্ছে— ভোটারদের মনোভাবকে আর একরৈখিক ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিহারে পরাজয়, মধ্যপ্রদেশে ব্যর্থতা এবং গুজরাটে জয়ের ব্যবধানের নাটকীয় পতন— তিনটি ঘটনাই একসঙ্গে গেরুয়া শিবিরের জন্য ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন