ফুটবল যদি মহাকাব্য হয়, রোনাল্ডো নিশ্চিতভাবেই কর্ণ

কর্ণ ছিলেন সূর্যপুত্র, পেয়েছিলেন সূতপুত্রের পরিচয়। রোনাল্ডো জন্মেছিলেন মাদেইরার অখ্যাত গলিতে, মা চেয়েছিলেন গর্ভপাত করাতে। দুজনেই ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়েছেন সারা জীবন। কর্ণ যেমন পরিচয়ের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিলেন, রোনাল্ডো তৃষ্ণার্ত ছিলেন বিশ্বকাপের জন্য। শেষটায় দুই বীরের পরিণতি একই—ট্র্যাজিক।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা: ম্যাচ চলছে টানটান উত্তেজনা। একে অপরের গোলে মুহুর্মুহু আক্রমণ। আচমকাই স্পেনের (Spain) ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে ভেসে আসা বলটা পিছন দিক থেকে ছুটে এল। সামনে গোলপোস্ট, পেছনে বল, বেরিয়ে যাচ্ছে আরও দূরে। এমন অবস্থায় কী করেন একজন ৪১ বছর বয়সী স্ট্রাইকার? তিনি থামেন। চোখের নিমেষে হিসেব কষেন। তারপর শরীরটাকে ঘুরিয়ে পিছন দিকে ঝুঁকিয়ে আকাশের দিকে পা তুলে দেন। নিপুণ দক্ষতায় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া বলকে বিপরীত দিকে থাকা গোলপোস্টে টেনে দিলেন হাফ বাইসাইকেল কিকের স্টাইলে। ২০২৬ বিশ্বকাপের এই একটা ঝলক মনে থেকে যাবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে রোনাল্ডোকে (Cristiano Ronaldo)।

বল গেল গোলের দিকে। স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমোন (Unai Simón) নিখুঁত দক্ষতায় ঝাঁপিয়ে জালে জড়ানো থেকে আটকে দিলেন রোনাল্ডোর শটটা। কয়েক ইঞ্চির ব্যবধান। আর সেই ইঞ্চিগুলোই আসলে ভাগ্যের ইঞ্চি।

কর্ণের জন্ম হয়েছিল কুন্তীর গর্ভে। অথচ মা-ই তাঁকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন নদীতে। রোনাল্ডোর জন্মও হয়েছিল এক দরিদ্র পরিচারিকার কোলে। মা ডলোরেস আভেইরো (Dolores Aveiro) গর্ভপাত করাতে চেয়েছিলেন। চিকিৎসক রাজি হননি। তাতেই বেঁচে গিয়েছিলেন যে শিশু, সে-ই একদিন হয়ে উঠেছিল ফুটবল বিশ্বের ঈশ্বর। কিন্তু ভাগ্য কি কখনও পুরোপুরি পক্ষে ছিল? কর্ণের ছিল না। রোনাল্ডোরও হল না।

সেই শট বাঁচানোর পর গোটা স্টেডিয়াম থমকে গিয়েছিল। কেউ চিৎকার করছেন না, কেউ হাততালি দিচ্ছেন না। শুধু নির্বাক বিস্ময়। কারণ সবাই বুঝে গিয়েছিলেন, এই শটটা ইতিহাস হয়ে যেত। যে ইতিহাস লেখা হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখানোর জন্য। কিন্তু ভাগ্য তা হতে দিল না। কর্ণের রথের চাকা যেমন বসে গিয়েছিল ঠিক যুদ্ধ জেতার মুহূর্তে, তেমনই বসে গেল রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ স্বপ্ন।

শেষ বাঁশি বাজল। পর্তুগাল (Portugal) ১-০ গোলে হেরে গেল স্পেনের কাছে। প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল। রোনাল্ডো আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন মাঠে। দুই হাতে মুখ ঢাকলেন। তারপর কাঁধ কাঁপতে শুরু করল। ৪১ বছর বয়সে শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছিলেন। বোধহয় নিজেও জানতেন, এটাই শেষ। ২০৩০ সালে যখন আবার বিশ্বকাপ বসবে, তখন তাঁর বয়স হবে ৪৫। সে বয়সে খেলা অসম্ভব। চোখের জলে মাঠ ছেড়েছেন রোনাল্ডো। ধীরে ধীরে কান্না থেমেছে। তারপর তিনি মুখ তুললেন সাংবাদিকদের দিকে।

রোনাল্ডোর এই কান্না দেখে থমকে যাওয়ার কারণ আছে। কারণ যিনি কাঁদছেন, তিনি নিছক কোনো ফুটবলার নন। কর্ণ সারা জীবন লড়েছিলেন নিজের ভাগ্যের বিরুদ্ধে। রোনাল্ডোও তাই। কর্ণ ছিলেন সূর্যপুত্র, কিন্তু পরিচয় পেয়েছিলেন সূতপুত্র হিসেবে। রোনাল্ডো জন্মেছিলেন মাদেইরা দ্বীপের (Madeira) এক অখ্যাত গলিতে। বাবা হোসে দিনিস আভেইরো (José Dinis Aveiro) ছিলেন মদে ডুবে থাকা এক মালি, মা রান্নার কাজ করতেন। ছোট্ট ক্রিশ্চিয়ানোদের একটাই ঘর। সেই ঘরেই বড় হয়েছেন তিনি। ১২ বছর বয়সে একা পাড়ি দেন লিসবনে। স্পোর্টিং সিপির (Sporting CP) যুব অ্যাকাডেমিতে জায়গা করে নেন মাত্র দেড় হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে। স্কুলের পড়াশোনা ছাড়তে হয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে এসে। ১৫ বছর বয়সে ধরা পড়ে ট্যাকিকার্ডিয়া—হৃৎস্পন্দনের এক গুরুতর অসুখ। লেজার সার্জারি করে তবেই স্বাভাবিক জীবনে ফেরা।

এই পর্তুগালের জন্যই তো তিনি সব করলেন। ১৪৬ গোল। ২৩৩ ম্যাচ। ইউরো কাপ (Euro Cup)। দুটো নেশনস লিগ (Nations League)। দেশের হয়ে তিনটে ট্রফি জিতিয়েছেন। শুধু একটা ট্রফির জন্যই বুকে পাথর বেঁধে অপেক্ষা করেছিলেন—বিশ্বকাপ। কর্ণ যেমন তৃষ্ণার্ত ছিলেন পরিচয়ের, রোনাল্ডো তৃষ্ণার্ত ছিলেন এই একটিমাত্র ট্রফির।

২০০২ সালের ১৪ অগস্ট, মাত্র ১৭ বছর বয়সে স্পোর্টিং সিপির প্রথম দলের হয়ে ইন্টার মিলানের (Inter Milan) বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ালিফায়ারে অভিষেক। সেই মরশুমেই ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৮, বি টিম ও প্রথম দল—পাঁচটি স্তরেই খেলার নজির গড়েন। ২০০৩ সালের ৬ অগস্ট স্পোর্টিং সিপি প্রীতি ম্যাচে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে (Manchester United) ৩-১ গোলে হারানোর পর ইউনাইটেড খেলোয়াড়েরা কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে (Sir Alex Ferguson) বলে দেন—এই ছেলেকে ছাড়া আর কাউকে নয়। ১২ অগস্ট ১২.২৪ মিলিয়ন পাউন্ডে রোনাল্ডো পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে, যা তখনকার ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে কিশোর খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ দাম। জর্জ বেস্ট (George Best), এরিক ক্যান্টোনা (Eric Cantona), ডেভিড বেকহ্যামের (David Beckham) কিংবদন্তির ৭ নম্বর জার্সি উঠল তাঁর গায়ে।

২০০৩ থেকে ২০০৯—ছয় মরশুম। তিনটে প্রিমিয়ার লিগ (Premier League), একটা চ্যাম্পিয়নস লিগ (Champions League), একটা ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ (FIFA Club World Cup), একটা এফএ কাপ (FA Cup), দুটো লিগ কাপ। ২০০৭-০৮ মরশুমে ৪২ গোল করে জেতেন প্রথম ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or)। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে এটাই ছিল তাঁর প্রথম সোনালি বল—প্রিমিয়ার লিগ আর চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের অসাধারণ এক মরশুমের পুরস্কার। প্রিমিয়ার লিগ ও ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু (European Golden Shoes) জেতা প্রথম উইঙ্গার। ২০০৮-এ ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ারও (FIFA World Player of the Year) ওঠে তাঁর হাতে।

২০০৯ সালে বিশ্বরেকর্ড ভেঙে ৮০ মিলিয়ন পাউন্ডে (৯৪ মিলিয়ন ইউরো) পাড়ি দিলেন স্বপ্নের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে (Real Madrid)। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে (Santiago Bernabéu) উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে ৮০ হাজারের বেশি দর্শক, ভেঙে দিল দিয়েগো মারাদোনার (Diego Maradona) ২৫ বছরের পুরনো রেকর্ড। নয় বছর। ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫০ গোল। ক্লাবের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। চারটে চ্যাম্পিয়নস লিগ—যার মধ্যে টানা তিনবার ইউরোপ সেরা হওয়ার কীর্তি আধুনিক ফুটবলে আর কেউ গড়তে পারেনি। এক মরশুমে ১৭ গোলের চ্যাম্পিয়নস লিগ রেকর্ড। সর্বোচ্চ ১৪০ গোল ও ৪২ অ্যাসিস্ট।

আর এই সময়টাতেই একের পর এক ব্যালন ডি’অর ঘরে তুলেছেন রোনাল্ডো। ২০০৮-এ প্রথম, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে। তারপর ২০১৩—লিওনেল মেসির (Lionel Messi) টানা চার বছরের রাজত্ব ভেঙে কাঁদতে কাঁদতে মঞ্চে উঠেছিলেন, যে কান্না বলে দিয়েছিল এই পুরস্কারটা ওঁর কাছে কতটা। ২০১৪—রেকর্ড-ভাঙা চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিযানের স্বীকৃতি। ২০১৬—রিয়াল মাদ্রিদকে আরেকটা চ্যাম্পিয়নস লিগ এনে দেওয়া আর পর্তুগালকে দেশের প্রথম বড় ট্রফি ইউরো কাপ জেতানোর অনন্য বছর। ২০১৭—লা লিগা (La Liga) আর চ্যাম্পিয়নস লিগ ডাবল জয়ের মরশুম, শেষ ব্যালন ডি’অর। পাঁচটি সোনালি বল—মেসির পরেই ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। দুই ক্লাবের জার্সিতে এই কীর্তি গড়া একমাত্র খেলোয়াড়।

২০১৮ সালে কর বিভাগের মামলা ও ক্লাব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে জুভেন্টাসে (Juventus) পাড়ি দিলেন ১০০ মিলিয়ন ইউরোতে, যা ৩০ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড়ের জন্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম। টানা দুটো সিরি আ (Serie A) শিরোপা, একটা কোপা ইতালিয়া (Coppa Italia), দুটো সুপারকোপা ইতালিয়ানা (Supercoppa Italiana)। ২০২১ সালে সিরি আ’র সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে জিতলেন কাপোকানোনিয়েরে (Capocannoniere)। ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি—তিনটে শীর্ষ লিগেই সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কীর্তি।

২০২১ সালে নাটকীয়ভাবে ফিরলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। প্রথম মরশুমে ২৪ গোল, প্রিমিয়ার লিগ টিম অফ দ্য ইয়ার, স্যার ম্যাট বাজবি প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার। কিন্তু ক্লাব ম্যানেজমেন্ট ও কোচ এরিক টেন হাগের (Erik ten Hag) সঙ্গে প্রকাশ্য বিবাদের জেরে ২০২২ সালের নভেম্বরে চুক্তি বাতিল।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে যোগ দেন সৌদি আরবের আল-নাসর ক্লাবে (Al-Nassr), ইতিহাসের সর্বোচ্চ ফুটবল বেতনে—বার্ষিক ২০০ মিলিয়ন ইউরো। ২০২৩-এ আরব ক্লাব চ্যাম্পিয়ন্স কাপ জেতেন। ২০২৪-এ সৌদি প্রো লিগে এক মরশুমে ৩৫ গোলের রেকর্ড গড়েন, প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে চারটে আলাদা লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ২০২৫-এ টানা দ্বিতীয়বার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা। চুক্তি নবায়ন করেন ২০২৭ পর্যন্ত। ২৩ অগস্ট ২০২৫-এ আল-নাসরের হয়ে ১০০ তম গোল করেন, চারটে আলাদা ক্লাবে ১০০ গোলের মাইলফলক ছোঁয়া ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়। ২৫ অক্টোবর ২০২৫-এ কেরিয়ারের ৯৫০ তম গোল। ২৪ নভেম্বর আল খালিজের বিপক্ষে সাইকেল কিকে গোল, ভোটে নির্বাচিত হয় মরশুমের সেরা গোল হিসেবে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ৩০ বছর বয়সের পর ৫০০ কেরিয়ার গোল করা প্রথম ফুটবলার। ৭ মে ২০২৬-এ সৌদি প্রো লিগে ১০০ গোলের মাইলফলক ছোঁয়া প্রথম খেলোয়াড়। ২১ মে ২০২৬-এ দামাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আল-নাসরকে সাত বছর পর প্রথম লিগ শিরোপা জেতান। পেশাদার কেরিয়ারে ১৩০০-র বেশি ম্যাচ, ৯৭০-এর বেশি গোল—সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

কিন্তু ক্লাব ফুটবলের এই সব চমকপ্রদ অর্জনের বাইরেও রোনাল্ডোর আরেকটা পরিচয় আছে—তিনি পর্তুগাল। ২০০৩ সালের ২০ অগস্ট, ১৮ বছর বয়সে কাজাখস্তানের বিপক্ষে লুইস ফিগোর (Luís Figo) বদলি হিসেবে নামেন। পরের বছরই ইউরো ২০০৪-এ ফাইনাল। ২০০৮ সালে স্থায়ী অধিনায়কত্ব। ২০১৪ সালে পাউলেতার (Pauleta) রেকর্ড ভেঙে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০১৫ সালে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন (Portuguese Football Federation) তাঁকে দেশের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা করে।

২০১৬ সালে ইউরো কাপ জয়। ফাইনালে ফ্রান্সের (France) বিপক্ষে ২৫ মিনিটেই চোট পেয়ে স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়েন, তবু সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। এডার (Eder) ১০৯ মিনিটে গোল করে পর্তুগালকে এনে দেন দেশের প্রথম বড় শিরোপা। রোনাল্ডো জেতেন সিলভার বুট। ২০১৯ সালে প্রথম নেশনস লিগ জয়, ফাইনালসে সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০২০ ইউরোতে গোল্ডেন বুট। ২০২৫-এ ফের নেশনস লিগ জয়, ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে গোল করে দলকে টাইব্রেকারে জেতান, ৪০ বছর বয়সে কোনো বড় আন্তর্জাতিক ফাইনালে গোল করা ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়।

২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি। রাউন্ড অফ ৩২-এ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ নকআউট গোল, ৪১ বছর ১৪৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপ নকআউট পর্বের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে পুরুষদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪৬ গোল, ২৩৩টি ম্যাচ খেলা, ১৪১টি ম্যাচ জয়ের রেকর্ড। একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ১৩টি ভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলেছেন। ২০২১ সালে ফিফা (FIFA) ওঁকে বিশেষ ‘আউটস্ট্যান্ডিং কেরিয়ার অ্যাচিভমেন্ট’ পুরস্কার দেয়। ২০২৪-এ উয়েফা (UEFA) দেয় ‘চ্যাম্পিয়নস লিগ অল-টাইম টপ স্কোরার’ সম্মাননা।

রোনাল্ডোর সাফল্য মাঠের বাইরেও। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার আর ইউটিউব মিলিয়ে এক বিলিয়নের বেশি ফলোয়ার—পৃথিবীর একমাত্র মানুষ হিসেবে এই মাইলফলক ছুঁয়েছেন। ফোর্বসের (Forbes) বিলিয়নিয়ার তালিকায় নাম। ২০১৪ সালে টাইম (Time) ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় জায়গা পেয়েছিলেন।

কিন্তু এই সব কিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০২৬ সালের সেই রাতে মাঠে বসে কাঁদছিলেন রোনাল্ডো। যে মানুষটা টাকা, খ্যাতি, পুরস্কার—সব পেয়েছেন, তিনি কাঁদছেন একটা শিরোপার জন্য। বিশ্বকাপের জন্য। যে শিরোপা পেতে ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ আর ২০২৬—টানা ছয়টা বিশ্বকাপ খেলে ফেললেন। শেষ বারের মতো চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন।

কান্না থামানোর পর সাংবাদিকদের তিনি বললেন, “আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আমি পর্তুগালের হয়ে তিনটে ট্রফি জিতেছি। আমি আসার আগে পর্তুগাল একটা ট্রফিও জিততে পারেনি। এটাই বাস্তব।”

ইউরো জয়কে বিশ্বকাপ জেতার সমান বলার পেছনে রোনাল্ডোর যুক্তি আরও জোরালো হয়, যখন তিনি স্মরণ করিয়ে দেন—ইউরোপের দলগুলোই তো বিশ্বকাপে দাপট দেখায়। যে ফ্রান্সকে হারিয়ে পর্তুগাল ইউরো জিতেছিল, সেই ফ্রান্সই তো গত আট বছরে দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে, একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তাঁর কথায়, “পর্তুগাল এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ট্রফি জিতেছে ২০১৬ সালে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। সত্যি বলতে ইউরো কাপ জয় আমার কাছে বিশ্বকাপ জেতারই সমান।”

এই কথার পর সমাজমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বলছে, এটা আত্মপ্রবঞ্চনা। কিন্তু যে মানুষটা এতগুলো লড়াই জিতেছেন, এতবার উঠে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর কি সত্যিই নিজেকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার প্রয়োজন আছে? বরং রোনাল্ডো বরাবরের মতোই সৎ। যে ছেলে মাদেইরার অলিগলি থেকে উঠে এসে স্কুল ছেড়েছিল ফুটবলের জন্য, ১৫ বছর বয়সে হার্টের অস্ত্রোপচার করিয়ে আবার বুট পরেছিল, বারবার ক্লাব বদলেছে কিন্তু কখনও নিজের মান বদলায়নি—সেই মানুষটার কাছে হার স্বীকার করাটা তো সহজ হতে পারে না। কিন্তু তিনি করলেন। মেনে নিলেন, বিশ্বকাপ নামের সেই সোনার হরিণটা অধরাই থেকে গেল।

টানেলে ঢোকার আগে একবারও পেছন ফিরে তাকালেন না রোনাল্ডো। কিন্তু গ্যালারিতে যাঁরা বসে কাঁদছিলেন, তাঁরা সবাই জানেন—এই মানুষটা আর ফিরবেন না বিশ্বকাপের আলোয়। যা থেকে যাবে, তা হলো সেই হাফ বাইসাইকেল শট, যে শট গোলে ঢোকেনি, কিন্তু প্রতিটা ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে ঢুকে গেছে চিরকালের জন্য।

আর থেকে যাবে এক বিষণ্ণ সত্য—ফুটবল যদি মহাকাব্য হয়, রোনাল্ডো নিশ্চিতভাবেই কর্ণ। যাঁর জন্ম কুন্তীর গর্ভে, অথচ মা-ই ভাসিয়ে দিয়েছিলেন নদীতে। যিনি সূর্যপুত্র হয়েও পরিচয় পেয়েছিলেন সূতপুত্র হিসেবে। যিনি সমস্ত অস্ত্রবলে বলীয়ান হয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। রোনাল্ডোও তেমনই—মায়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জন্ম, দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে উঠে আসা, পাঁচ ব্যালন ডি’অর, পাঁচ চ্যাম্পিয়নস লিগ, দেশকে দেওয়া তিনটে ট্রফি। সব পেয়েছেন। শুধু একটা ট্রফির জন্যই বুকে পাথর বেঁধে অপেক্ষা করেছিলেন—বিশ্বকাপ। কর্ণ যেমন তৃষ্ণার্ত ছিলেন পরিচয়ের, রোনাল্ডো তৃষ্ণার্ত ছিলেন এই একটিমাত্র ট্রফির। আর সেই তৃষ্ণাই ওঁকে অমর করে রাখবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন