‘হুজুগ’ থেকে ‘জাস্টিস’— মমতার এই দ্বিচারিতা কি মানুষ মনে রাখেনি?

নজরবন্দি সম্পাদকীয়: ২০২৪-এ আরজি করের আন্দোলন ছিল 'হুজুগ', ভিসেরা নষ্টের নির্দেশ দিয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা। ২০২৬-এ বারুইপুরকাণ্ডে সেই একই 'জাস্টিস' স্লোগান হাতিয়ার করে পথে নামলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। এ কী নিছক সুবিধাবাদ, নাকি বাঙালির স্মৃতি নিয়ে উপহাস?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রাজনীতির মঞ্চে দ্বিচারিতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন সেই দ্বিচারিতা এতটাই স্থূল হয় যে দু’বছরের ব্যবধানে একই মুখের দুই উচ্চারণ জনতার স্মৃতির দেয়ালে ধাক্কা খায়, তখন সেটা আর সাধারণ ভুল বোঝাবুঝি থাকে না। সেটা হয়ে ওঠে সুবিধাবাদের চূড়ান্ত নমুনা। আজকের বারুইপুরকাণ্ডে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাস্টিস’ স্লোগান ঠিক তেমনই এক রাজনৈতিক কসরত, যা দেখে থমকে দাঁড়াতে হচ্ছে বাংলাকে।

যখন ‘জাস্টিস’ শব্দটা ছিল শেল

মনে করুন, ২০২৪ সালের আগস্ট। আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। রাজ্যের শাসকদলের অন্দরমহলের লোকজন জড়িত, এমন অভিযোগে ফুঁসছে গোটা বাংলা। রাস্তায় নামছে হাজার হাজার মানুষ। ‘জাস্টিস ফর আরজি কর’, ‘তোমার স্বর আমার স্বর, জাস্টিস ফর আরজি কর’ স্লোগানে কাঁপছে কলকাতার রাত। সেই আন্দোলনকে কী বলেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী? “ওটা হুজুগ। বাম-অতি বামদের উসকানি। এভাবে তো বিচার হয় না।” শুধু কথায় নয়, কাজেও ছিল সেই একরোখা মনোভাব।

আজ নতুন করে জানা যাচ্ছে, নির্যাতিতার ভিসেরার নমুনা নষ্ট করার নির্দেশ নাকি সরাসরি দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। শুধু তাই নয়, কলকাতা পুলিশের তৎকালীন শীর্ষ কর্তারা একের পর এক সাংবাদিক সম্মেলন করে আসল অপরাধীদের আড়াল করেছিলেন। যে কমিশনার ক্লিনচিট দিয়েছিলেন, সেই কমিশনার আজ সাসপেন্ডেড। সে সময়কার পুলিশি তদন্ত ছিল শুধুই চোখে ধুলো দেওয়ার মহড়া। আর এই পুরো কসরতের নেপথ্যে ছিলেন খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। বিচারপ্রার্থী মানুষের চোখে তখন তিনি ছিলেন প্রতিপক্ষ। ‘জাস্টিস’ শব্দটা তাঁর কাছে ছিল যেন ব্যক্তিগত অপমান।

যখন সেই ‘জাস্টিস’-ই হয়ে উঠল সম্বল

কাট টু ২০২৬। বিধানসভা ভোটে গোহারা হেরে তৃণমূল এখন বিরোধী। দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন, নিজের অবস্থান নিয়েও টানাপোড়েন। ঠিক সেই সময় ঘটল বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ-খুনের ঘটনা। আর তখনই মঞ্চ বদলে গেল এক লহমায়। যে ‘জাস্টিস’ শব্দটা এতদিন ছিল শেল, সেটাকেই এবার হাতিয়ার করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কালীঘাট থেকে মোমবাতি মিছিল। গলায় সুর— ‘তোমার আমার এক সুর, জাস্টিস ফর বারুইপুর।’ অথচ ঠিক একই ভাষার স্লোগান দু’বছর আগে তুলেছিলেন আরজি করের আন্দোলনকারীরা— ‘তোমার স্বর আমার স্বর, জাস্টিস ফর আরজি কর’।

এ তো চুরি! আন্দোলনের ভাষা, মিছিলের ধাঁচ, মোমবাতির প্রতীকী ব্যবহার— সবই হুবহু কপি-পেস্ট সেই আরজি কর আন্দোলনের। যাঁদের তিনি বলেছিলেন ‘হুজুগ’, ‘উসকানি’, আজ নিজে তাঁদেরই ভাষা ধার করে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই লড়ছেন। এ যে শুধু সুবিধাবাদ নয়, এ বাঙালির স্মৃতিকে উপহাস করার শামিল।

একটু স্মৃতিতে টোকা দেওয়া যাক

আরজি কর আন্দোলনের সময় যাঁরা রাস্তায় নেমেছিলেন, তাঁদের কতজনকে শুনতে হয়েছে ‘নকশাল’, ‘অতি বাম’, ‘উসকানিদাতা’— এমন বিশেষণ? কত তরুণ-তরুণীর গায়ে লাঠি পড়েছে, কত মানুষের চোখের জল দেখেছে কলকাতার রাত? সেই মানুষগুলোর কাছে আজকের এই ‘জাস্টিস’ স্লোগান নিশ্চয়ই খুব ‘হুজুগ’ নয়? নাকি এখন আর হুজুগ নয়, কারণ এখন এটা নিজের প্রয়োজনের ‘জাস্টিস’?

বারুইপুরকাণ্ডের পরিস্থিতি আরজি করের মতো ‘আড়াল’ করার নয়— কারণ এখন ক্ষমতায় শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন, মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার— প্রশাসনের এই স্পিড গত এক দশকে বিরল। অথচ এই তৎপরতাকে কোনও কৃতিত্ব না দিয়ে সরাসরি রাস্তায় নেমে ‘জাস্টিস’ চাওয়ার মানেটা কী? উত্তরটা খুব সোজা। আদতে এখানে ‘জাস্টিস’ নয়, খোঁজ চলছে হারানো রাজনৈতিক মাটির। নিজের করা অবিচারকে আড়াল করতেই আজকের এই ‘বিচার’-এর মহড়া।

শেষ কথা: মুখ দেখবেন, নাকি মুখোশ?

বাঙালির স্মৃতি বড় নিষ্ঠুর। সে ভুলে না। যাঁরা দু’বছর আগে আন্দোলনকারীদের ‘হুজুগ’ বলেছিলেন, আজ তাঁদের মুখে ‘জাস্টিস’ শুনলে সেই স্মৃতি ধাক্কা দেবে নিশ্চয়ই। আরজি করের বিচারহীনতার দায় যাঁর কাঁধে, সেই মানুষটি আজ বিরোধী হয়ে বারুইপুরের বিচার চাইতে গেলে মানুষ প্রশ্ন তুলবেই। এটা দ্বিচারিতা নয়, এ রাজনীতির চূড়ান্ত মুখোশ-পরিচ্ছদ। আর মুখোশের আয়ু বড়ই কম।

২০২৪-এর ‘হুজুগ’ ২০২৬-এ এসে ‘জাস্টিস’ হয়ে গেল— এই গল্প বাঙালি ভুলবে না। কারণ ইতিহাস স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিভ্রংশতায় বিশ্বাস করে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বোধহয় সেটা ভুলেই গিয়েছিলেন। অথবা, ভুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ তো আর ভোলেনি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন