বাঙালির ঘরে লক্ষ্মীর দু’টি হাত, অন্য রূপে চার! পদ্ম, ধান, পেঁচা আর ঘটের নেপথ্যের কাহিনি

বাংলার ঘরোয়া লক্ষ্মীমূর্তির দু’টি হাত থেকে পদ্ম, ধানের শিষ, পেঁচা, ঘট ও মাটির সরা—দেবীর নানা রূপ ও উপকরণের ধর্মীয় তাৎপর্য এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্যের পরিচয় জানুন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে পদ্মাসনা দেবী, পাশে পেঁচা, হাতে শস্যের প্রতীক কিংবা আশীর্বাদের ভঙ্গি। তবে বাংলার ঘরোয়া লক্ষ্মীমূর্তির সঙ্গে দেশের অন্য অঞ্চলে প্রচলিত লক্ষ্মীর রূপের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোথাও দেবীকে দু’হাতে, কোথাও চার হাতে দেখা যায়। আবার অনেক বাঙালি পরিবারে মাটির মূর্তির বদলে লক্ষ্মীসরা, ঘট কিংবা ধানভরা পাত্রেই দেবীর আরাধনা করা হয়।

এই পার্থক্যের পিছনে রয়েছে আঞ্চলিক সংস্কৃতি, লোকাচার, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজজীবনের দীর্ঘ ঐতিহ্য। লক্ষ্মীপুজোর উপকরণগুলির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বাঙালির কাছে দেবী শুধু ধনসম্পদের প্রতীক নন, শস্য, গৃহস্থালি ও সমৃদ্ধির সঙ্গেও তাঁর আরাধনা জড়িয়ে রয়েছে।

বাংলার লক্ষ্মীমূর্তিতে দু’টি হাত, অন্য রূপে চার কেন?

বাংলার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় প্রচলিত অনেক মূর্তিতে দেবীকে দু’হাতে দেখা যায়। একটি হাত আশীর্বাদ বা অভয়ের ভঙ্গিতে থাকে, অন্য হাতে থাকে শস্য, পাত্র কিংবা সমৃদ্ধির প্রতীক। তবে মূর্তির ধরন ও শিল্পীর নির্মাণশৈলী অনুযায়ী হাতে থাকা সামগ্রী এবং মুদ্রায় পার্থক্য দেখা যায়।

অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্মীর চার হাতের মূর্তি বিশেষভাবে পরিচিত। সেই রূপে দেবীর হাতে পদ্ম, আর একটি হাত বরাভয় বা আশীর্বাদের ভঙ্গিতে থাকতে পারে; কোনও কোনও প্রতিমায় হাত থেকে মুদ্রা ঝরে পড়ার চিত্রও দেখা যায়। এই রূপকে বাংলার দু’হাতের লক্ষ্মীমূর্তির সঙ্গে তুলনা করলে আঞ্চলিক প্রতিমাশিল্পের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়।

কলকাতার প্রতিমাশিল্পীদের কাজ নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলার কোজাগরী লক্ষ্মী এবং দীপাবলির সময়ে পূজিত চারহাতের লক্ষ্মীর এই পার্থক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে দু’হাত বা চার হাতের রূপকে সর্বত্র একই নিয়মে বাঁধা যায় না; অঞ্চল, পূজাপদ্ধতি ও প্রতিমার ধরন অনুযায়ী তার বৈচিত্র রয়েছে।

পদ্মের উপর বসে থাকেন কেন দেবী?

লক্ষ্মীর মূর্তিতে পদ্ম একটি পরিচিত প্রতীক। বহু প্রতিমায় দেবীকে পদ্মের উপর উপবিষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় পদ্ম পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যের সঙ্গে যুক্ত। সেই কারণেই লক্ষ্মীর প্রতিমা ও ছবিতে পদ্মের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার ঘরোয়া পুজোয় পদ্ম শুধু প্রতিমার অংশ নয়, পুজোর ফুল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তবে পদ্মের ধর্মীয় তাৎপর্যের ব্যাখ্যা বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ও আঞ্চলিক পরম্পরায় আলাদা হতে পারে। তাই এর অর্থকে একটি মাত্র ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা যায় না।

ধানের শিষে বাংলার কৃষিজীবনের ছাপ

লক্ষ্মীর সঙ্গে ধান ও শস্যের সম্পর্ক বাংলার পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বহু প্রতিমা ও সরাচিত্রে ধানের শিষ বা শস্যভরা পাত্রের ছবি দেখা যায়। গ্রামীণ বাংলায় ধান ছিল খাদ্য, জীবিকা এবং গৃহস্থের সচ্ছলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ফসল ঘরে ওঠা মানেই পরিবারের সারা বছরের খাদ্যসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক।

সেই কৃষিজীবনের ছাপ লক্ষ্মীপুজোর উপকরণেও রয়েছে। পুজোয় ধান রাখা, শস্যের প্রতীক সাজানো কিংবা ধানভরা পাত্রকে দেবীর রূপে আরাধনা করার রীতি বিভিন্ন পরিবারে প্রচলিত। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে লক্ষ্মী তাই ধনসম্পদের পাশাপাশি শস্য ও গৃহস্থালির মঙ্গলের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত।

জাতীয় জাদুঘরের ভার্চুয়াল সংগ্রহে বাংলার লক্ষ্মীসরার বর্ণনায়ও ধানের শিষকে ভালো ফসলের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই সরাচিত্রে দেবীর সঙ্গে পেঁচার উপস্থিতিও বাংলার প্রতিমাশিল্পের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন?

বাংলার লক্ষ্মীমূর্তির পাশে পেঁচা দেখা যায়। ধর্মীয় পরম্পরায় পেঁচাকে দেবী লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাই প্রতিমা, সরাচিত্র এবং আলপনায়ও পেঁচার উপস্থিতি দেখা যায়।

পেঁচা নিশাচর পাখি। কৃষিজমিতে ইঁদুরের মতো প্রাণী খেয়ে সে ফসল রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে প্রকাশিত কিছু গবেষণামূলক আলোচনায় পেঁচার সঙ্গে শস্যভাণ্ডার রক্ষার এই সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে। তবে পেঁচাকে লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে মানার ধর্মীয় বিশ্বাস এবং তার পরিবেশগত ভূমিকা—দুটি আলাদা বিষয়।

ঘট, সরা, ধানভরা পাত্র—মূর্তি ছাড়াও লক্ষ্মীপুজো

বাংলার সব পরিবারে লক্ষ্মীপুজোয় মাটির প্রতিমা ব্যবহৃত হয় না। বহু পরিবারে আঁকা মাটির সরা, ঘট, ধানভরা ঝুড়ি বা অন্য প্রতীককে দেবীর আসন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করা হয়। এই রীতিগুলির মধ্যে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যও রয়েছে, যা দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা বহু পরিবার ধরে রেখেছে।

লক্ষ্মীসরা হল মাটির তৈরি একটি পাত্র বা চাকতির মতো বস্তু, যার গায়ে দেবী ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীক আঁকা থাকে। সরা তৈরির বিভিন্ন আঞ্চলিক ঘরানা রয়েছে। কোথাও দেবীকে একা, কোথাও পরিবারের অন্যান্য দেবদেবী বা পেঁচাসহ আঁকা হয়। সরাচিত্রের এই বৈচিত্র বাংলার পটচিত্র ও মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত।

ঘটলক্ষ্মী বা ধানভরা পাত্রের পুজোয় শস্য ও জলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিছু পরিবারে কাঠের জলচৌকির উপর ঘট স্থাপন করা হয়, আবার কোথাও ধানভরা ঝুড়ি বা অন্য গৃহস্থালি সামগ্রীকে দেবীর প্রতীক হিসেবে সাজানো হয়। পুজোর ধরন পরিবার ও আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী বদলে যায়।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আর ধানের লক্ষ্মীপুজো কি এক?

বাংলার বিভিন্ন পরিবারের লক্ষ্মীপুজোর সময় ও রীতিতেও পার্থক্য রয়েছে। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আশ্বিন মাসের পূর্ণিমায় পালিত হয়। অন্যদিকে, বহু পরিবারে কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। কোথাও দেবীর মূর্তি ব্যবহৃত হয়, আবার কোথাও ধান, ঘট, সরা বা অন্য প্রতীকই পুজোর মূল উপকরণ।

পূর্ববঙ্গ থেকে আসা বহু পরিবারের কোজাগরী পুজোয় সরা, ধানভরা নৌকা বা অন্য প্রতীকী উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের কিছু পরিবারে ধানের গোলা বা শস্যভরা পাত্রের প্রতীকী আরাধনার রীতিও প্রচলিত। তবে এই পার্থক্যকে সব বাঙাল পরিবারের জন্য এক নিয়ম এবং সব ঘটির পরিবারের জন্য অন্য নিয়ম বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পরিবার, অঞ্চল ও বংশপরম্পরার ভিত্তিতে রীতির ভিন্নতা রয়েছে।

লক্ষ্মীপুজোর উপকরণে বেঁচে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্য

দু’হাতের লক্ষ্মীমূর্তি, পদ্ম, ধানের শিষ, পেঁচা, ঘট কিংবা মাটির সরা—প্রতিটি উপকরণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির নানা স্তর। বাংলার কৃষিনির্ভর জীবন, গৃহস্থালির রীতি এবং প্রতিমাশিল্পের নিজস্ব ধারা লক্ষ্মীপুজোর মাধ্যমে আজও নানা পরিবারে বহমান।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে তাই একই দেবীর আরাধনায় দেখা যায় একাধিক রূপ। কোথাও মাটির প্রতিমা, কোথাও আঁকা সরা, আবার কোথাও ধানভরা পাত্রই পুজোর কেন্দ্র। এই বৈচিত্রই বাংলার লক্ষ্মীপুজোর লোকঐতিহ্যকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর