বাংলার লক্ষ্মীপুজোর ঐতিহ্য: কোথাও সরা, কোথাও প্রতিমা—জানুন নানা রীতি

বাংলার বিভিন্ন পরিবারে লক্ষ্মীপুজোর রীতি এক নয়। কোথাও মাটির সরা, কোথাও প্রতিমা, আবার কোথাও ঘট স্থাপন করে চলে দেবীর আরাধনা। জানুন এই বৈচিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকশিল্প ও পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বাংলার ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন এক হলেও তার রূপ সর্বত্র এক নয়। কোথাও দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা হয় মাটির সরায় আঁকা ছবি সামনে রেখে, কোথাও পূজিত হন মৃন্ময়ী প্রতিমা, আবার কোনও বাড়িতে লক্ষ্মীর ছবি বা ঘট স্থাপন করেই পুজো করা হয়। আলপনা, ধান-দুর্বা, পদ্মফুল, নৈবেদ্য, খই-মুড়ি আর লক্ষ্মীর পাঁচালি—এই পরিচিত উপকরণগুলির মধ্যেও অঞ্চল, পরিবার ও পারিবারিক উত্তরাধিকারের ছাপ স্পষ্ট।

দুর্গাপুজোর পর আশ্বিন মাসের পূর্ণিমায় পালিত কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো বাঙালি হিন্দু পরিবারের অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় উৎসব। তবে বাংলায় লক্ষ্মীপুজো শুধু কোজাগরী পূর্ণিমাতেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক পরিবারে সারা বছর প্রতি বৃহস্পতিবার, আবার কোথাও নির্দিষ্ট পারিবারিক তিথি বা উপলক্ষেও দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। এই পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বাংলার লোকসংস্কৃতি, গৃহস্থালির ঐতিহ্য এবং প্রজন্মান্তরে চলে আসা পারিবারিক রীতিও প্রকাশ পায়।

লক্ষ্মীর সরা- বাংলার নিজস্ব লোকশিল্পের পরিচিত রূপ: বাংলার লক্ষ্মীপুজোর অন্যতম পরিচিত উপকরণ লক্ষ্মীর সরা। সাধারণত মাটির তৈরি গোল বা অর্ধগোলাকার পাত্রের উপর দেবী লক্ষ্মী এবং কখনও তাঁর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য প্রতীক বা চরিত্রের ছবি আঁকা থাকে। এই সরা তৈরি ও সাজানোর রীতিতে বাংলার পটচিত্র এবং স্থানীয় মৃৎশিল্পের প্রভাব দেখা যায়।
[লক্ষ্মীর পাঁচালি: কেন পাঠ করা হয়? জানুন পুজোর নিয়ম ও প্রচলিত কাহিনি]

সরা তৈরির ধরন, রং, ছবির বিন্যাস ও অলংকরণ শিল্পী এবং অঞ্চলভেদে বদলে যায়। কোথাও দেবী লক্ষ্মীর মুখ ও দেহের প্রতীকী ছবি প্রধান, কোথাও সরা জুড়ে থাকে একাধিক চরিত্র ও অলংকরণ। এই শিল্পকর্ম শুধু পুজোর উপকরণ নয়, স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতা ও লোকশিল্পের ধারাবাহিকতারও পরিচয় বহন করে।

অনেক পরিবারে বংশপরম্পরায় ব্যবহৃত লক্ষ্মীর সরা যত্ন করে রাখা হয়। আবার অনেকে প্রতি বছর নতুন সরা কেনেন। তবে এই প্রথা সব পরিবারের ক্ষেত্রে এক নয়। সরা ব্যবহারের রীতি অনেক জায়গায় পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও বাংলার সব অঞ্চলে একই ধরনের সরা প্রচলিত নয়।

কোথাও লক্ষ্মীর প্রতিমা, কোথাও ছবি বা ঘট: লক্ষ্মীপুজোয় দেবীর উপস্থাপনাও পরিবারভেদে আলাদা। বহু বাড়িতে মাটির তৈরি লক্ষ্মীপ্রতিমা স্থাপন করে পুজো করা হয়। প্রতিমায় দেবীকে পদ্মাসনে বসা, অলংকারে সজ্জিত এবং পাশে পেঁচাসহ বিভিন্ন প্রচলিত রূপে দেখা যায়। আবার কোথাও দেবীর ছবি বা সরা দিয়েই পুজো সম্পন্ন হয়।

কিছু পরিবারে ঘট স্থাপন লক্ষ্মীপুজোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘটের মধ্যে জল রেখে তার সঙ্গে আম্রপল্লব, নারকেল ও অন্যান্য উপকরণ সাজানো হয়—যদিও নির্দিষ্ট পদ্ধতি পরিবার ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। কোথাও প্রতিমা বা সরা স্থাপনের পাশাপাশি ঘটও থাকে।
[কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ২০২৬ কবে ও কখন? জেনে নিন পূর্ণিমার তিথি, শুভ সময় ও পুজোর সম্পূর্ণ পদ্ধতি]

এই পার্থক্যকে পুজোর গুরুত্বের কমবেশি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে একই দেবীর আরাধনার নানা রূপ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি প্রচলিত রয়েছে। পরিবারে যে পদ্ধতি চলে আসছে, বহু মানুষ সেই রীতিকেই বিশেষ গুরুত্ব দেন।

আলপনা ও লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, ঘর সাজানোর আচার: লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে আলপনার সম্পর্ক বাংলার পরিচিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। চালের গুঁড়ি দিয়ে মেঝেতে নকশা আঁকা হয়। পদ্ম, গোলাকার নকশা, ধানের শিষ, শঙ্খ বা অন্যান্য শুভ প্রতীক অনেক আলপনায় দেখা যায়। তবে নকশার ধরন শিল্পী, পরিবার এবং অঞ্চলের রুচি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।

বহু বাড়িতে প্রবেশপথ থেকে পুজোর জায়গা পর্যন্ত লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকার রীতি রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই পায়ের ছাপ দেবীর আগমন ও শুভতার প্রতীক। কেউ পায়ের ছাপ ঘরের ভিতরের দিকে আঁকেন, আবার কোথাও আলপনার নকশা ভিন্ন হয়। এগুলি প্রচলিত বিশ্বাস ও পারিবারিক রীতি—সব জায়গায় একই নিয়ম মানা হয় না।

আলপনা আঁকার কাজ অনেক পরিবারে বাড়ির সদস্যরা একসঙ্গে করেন। ফলে পুজোর প্রস্তুতি শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, পরিবারের মধ্যে সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস ভাগ করে নেওয়ার উপলক্ষও হয়ে ওঠে।

ধান, দুর্বা, পদ্ম ও নৈবেদ্য, পুজোর উপকরণে গৃহস্থালির ছাপ: লক্ষ্মীপুজোর উপকরণে ধান, চাল, ফল, ফুল এবং নানা খাদ্যসামগ্রীর উপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। দেবী লক্ষ্মীকে বহু ধর্মীয় পরম্পরায় ধন-সম্পদ, শস্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে মানা হয়। সেই বিশ্বাসের সঙ্গে মিল রেখেই বহু পরিবারে পুজোর নৈবেদ্যে ধান, আতপ চাল, ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী রাখা হয়।

পদ্মফুল দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে যুক্ত একটি পরিচিত প্রতীক। তবে সব পুজোয় পদ্মফুল পাওয়া বা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না; ফুলের প্রাপ্যতা ও পারিবারিক নিয়মের ওপর উপকরণ নির্ভর করতে পারে। একইভাবে ধান, দুর্বা, ফল বা অন্যান্য উপকরণ ব্যবহারের পদ্ধতিও একেক বাড়িতে একেক রকম হতে পারে।

এই উপকরণগুলির মধ্যে কৃষি, খাদ্য ও গৃহস্থালির সঙ্গে বাঙালির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা যায়। তবে প্রতিটি উপকরণের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করতে হলে আলাদা গবেষণামূলক সূত্র প্রয়োজন।

খই, মুড়ি, চিঁড়ে, নাড়ু ইত্যাদি ভোগের ঐতিহ্য: বাংলার বহু বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর নৈবেদ্যে খই, মুড়ি, চিঁড়ে, নারকেলের নাড়ু, ফল ও মিষ্টি থাকে। অনেক পরিবারে পায়েসও তৈরি করা হয়। কোথাও পরিবারের নিজস্ব রীতি মেনে আরও নানা নিরামিষ পদ নিবেদন করা হয়। এই আয়োজনের ধরন নির্ভর করে পারিবারিক অভ্যাস, স্থানীয় রীতি এবং পরিবারের সামর্থ্যের ওপর।

ভোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ঘরোয়া রান্না ও পারিবারিক স্মৃতিও। মায়েদের বা পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে শেখা নাড়ু বানানো, পায়েস রান্না বা নৈবেদ্য সাজানোর পদ্ধতি অনেক পরিবারে প্রজন্মান্তরে চলে আসে। ফলে লক্ষ্মীপুজোর ভোগ শুধু ধর্মীয় নিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিরও অংশ হয়ে ওঠে।

তবে নির্দিষ্ট কোনও পদ সব বাঙালি পরিবারে বাধ্যতামূলক—এমন দাবি করা ঠিক নয়। পুজোর ভোগ ও নিবেদনের রীতি অঞ্চল ও পরিবারভেদে বদলায়।

লক্ষ্মীর পাঁচালি: পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পাঠের ঐতিহ্য: লক্ষ্মীপুজোর আরেকটি পরিচিত রীতি হল লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ। বাংলা পাঁচালি সাহিত্যে দেবদেবীর মাহাত্ম্য, ব্রত এবং ধর্মীয় কাহিনি ছন্দে বর্ণিত হয়। বহু পরিবারে পুজোর পরে লক্ষ্মীর পাঁচালি বা ব্রতকথা পাঠ করা হয়, অন্য সদস্যরা তা শোনেন।

কোজাগরী পূর্ণিমার পুজোতে যেমন পাঁচালি পাঠের প্রচলন রয়েছে, তেমনই অনেক বাড়িতে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজোর পরেও এই রীতি পালন করা হয়। তবে কোন পাঁচালি পড়া হবে, কখন পাঠ হবে এবং কীভাবে পুজোর অন্যান্য আচার সম্পন্ন হবে—তা পরিবারের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।

পাঁচালির কাহিনিতে দেবী লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য, ব্রত পালনের কথা এবং সংসারের শান্তি-সমৃদ্ধি নিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ পায়। এগুলিকে লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় আখ্যান হিসেবে দেখা উচিত; কাহিনিতে বর্ণিত অলৌকিক ঘটনাকে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

কোজাগরী পূর্ণিমা ও বাংলার লক্ষ্মীপুজো: আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিকে কেন্দ্র করে পালিত কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো বাংলার বহু পরিবারের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ‘কোজাগরী’ শব্দের সঙ্গে প্রচলিত ‘কো জাগর্তি’—অর্থাৎ, ‘কে জেগে আছে?’—ব্যাখ্যাটি যুক্ত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে দেবী লক্ষ্মী মর্ত্যে বিচরণ করেন এবং জেগে থাকা ভক্তদের আশীর্বাদ করেন। এই বিশ্বাসের সূত্রে কোথাও রাত জাগা, পাঁচালি পাঠ বা নামগানের রীতি দেখা যায়।

তবে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আচার সব জায়গায় এক নয়। কোথাও সন্ধ্যায় পুজো সম্পন্ন হয়, কোথাও রাত পর্যন্ত উপাসনা চলে। পুজোর সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিথি ও স্থানীয় পঞ্জিকা গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট বছরের পুজোর দিন ও সময় জানতে নির্ভরযোগ্য বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ করা উচিত।

বাংলার বাইরে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও আশ্বিনের পূর্ণিমাকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি রয়েছে। তবে সেগুলিকে বাংলার লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখা যায় না। আঞ্চলিক নাম, বিশ্বাস ও আচারে পার্থক্য রয়েছে।

একই পুজো, নানা পারিবারিক রীতি: বাংলার লক্ষ্মীপুজোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল এর বৈচিত্র। কোনও পরিবারে সরা ব্যবহারের ঐতিহ্য বহু পুরোনো, কোনও পরিবারে প্রতি বছর নতুন প্রতিমা আনা হয়, আবার কোথাও ছবি বা ঘটের মাধ্যমে পুজো করা হয়। আলপনা, নৈবেদ্য, পাঁচালি পাঠ এবং পুজোর সময় নিয়েও পার্থক্য দেখা যায়।

এই বৈচিত্রকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের বাইরে বলে বিচার করার প্রয়োজন নেই। লোকাচার সাধারণত অঞ্চল, পরিবার, স্থানীয় শিল্প এবং সামাজিক অভ্যাসের সঙ্গে বদলাতে বদলাতে এগিয়ে চলে। লক্ষ্মীপুজোর ক্ষেত্রেও সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়। একই ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে নানা রীতির সহাবস্থান বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকেই তুলে ধরে।

বাংলার লক্ষ্মীপুজো তাই শুধু দেবীর আরাধনা নয়; সরা ও প্রতিমাশিল্প, আলপনা, পাঁচালি, ঘরোয়া ভোগ এবং পারিবারিক স্মৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রীতিগুলি বহন করে চলেছেন অসংখ্য পরিবার ও স্থানীয় শিল্পী। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সেই শিল্প, শ্রম ও লোকসংস্কৃতিকে বোঝাও লক্ষ্মীপুজোর ঐতিহ্যকে জানার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর