ভোটই শেষ কথা—আর সেই ভোটের পথে সবচেয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র এখন ‘সেটিং’। বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মুখোমুখি তিন শিবির—তৃণমূল, বিজেপি ও সিপিএম—ভাষায় আলাদা, নিশানায় এক। একে অপরের দিকে আঙুল তুলে ‘বোঝাপড়া’র তত্ত্ব ছুড়ে দিচ্ছে সবাই। উদ্দেশ্য একটাই—প্রতিপক্ষের ভোটে ফাটল ধরানো, নিজের বাক্স ভারী করা।
ভোটের আগে বাম-রাম, সিপেমূল, বিজেমূল—নামে আলাদা, অর্থে এক। তৃণমূল, বিজেপি ও সিপিএম—তিন শিবিরই ‘সেটিং’ তত্ত্বে শান দিচ্ছে। রাজনীতির এই পুরনো কৌশলেই কি লুকিয়ে ভোটের নতুন অঙ্ক?


২০১৯ লোকসভা ভোটের পর থেকেই তৃণমূলের প্রচারে জোর পায় ‘বাম-রাম’ তত্ত্ব—যার সারকথা, বামের ভোট বিজেপিতে সরে গিয়েছে। যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, বাম ভোট কমার সঙ্গে সঙ্গে বিজেপির উত্থান। এই বয়ান দিয়ে তৃণমূল বোঝাতে চায়, বিজেপির শক্তির জ্বালানি আসলে বাম ভোট।
পাল্টা সিপিএমের বক্তব্য, বিজেপিকে রাজ্যে হাত ধরে এনেছিল তৃণমূলই। কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি, আর রাজ্যে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ‘মাথা’ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সংস্থার না-পৌঁছনো—এই দুই যুক্তিতে সিপিএম তুলে ধরে তৃণমূল-বিজেপির ‘বোঝাপড়া’। ‘বিজেমূল’ শব্দবন্ধটি আনুষ্ঠানিক ভাবে কম ব্যবহার হলেও, ‘সেটিং’ তত্ত্ব থেকে তারা সরে আসেনি—ভোটের মুখে বরং তা আরও জোরালো।
অন্য দিকে, সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’য় কাগজে-কলমে একসঙ্গেই রয়েছে তৃণমূল ও সিপিএম। সেই সুযোগে বিজেপি তৈরি করছে ‘সিপেমূল’ বয়ান। ২০২৪ লোকসভা ভোটের আগেই এই শব্দবন্ধে শান দিয়েছে পদ্মশিবির; বিধানসভা ভোটের আগে তা আরও তীব্র। সম্প্রতি রাজ্য বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ভিডিওয় সিপিএম-তৃণমূলের ‘বোঝাপড়া’ তুলে ধরা হয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী-র অভিযোগ, ২০২১-এ বহু আসনে সিপিএম ‘ভোটকাটুয়া’ হয়ে বিজেপিকে হারিয়ে তৃণমূলকে জিতিয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-ও ‘হিন্দু কমরেড’দের উদ্দেশে সেই বার্তাই দিচ্ছেন।


তিন পক্ষের অঙ্ক আলাদা। তৃণমূল চায় বিজেপি-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ ভোট একত্র করতে। বিজেপির লক্ষ্য বাম ঘরানার যে ‘হিন্দু’ ভোট এখনও ভাসমান, তা টেনে আনা। সিপিএমের লড়াই অস্তিত্বের—শূন্যের গেরো কাটাতে ‘সেটিং’ তত্ত্বেই ভরসা।
এই তত্ত্ব কি নতুন? ইতিহাস বলছে, মোটেও নয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভাজনের পর কংগ্রেস-সিপিআই ঘনিষ্ঠতাকে কটাক্ষ করে দেওয়ালে লেখা হয়েছিল—‘দিল্লি থেকে এল গাই, সঙ্গে বাছুর সিপিআই’। সত্তরের দশকে কংগ্রেস-নকশাল বোঝাতে চালু হয় ‘কংশাল’। কংগ্রেস ছেড়ে বেরোনোর সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ ছিল বিধান ভবন ও আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের ‘বোঝাপড়া’র বিরুদ্ধে। সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে বলা হয়েছিল ‘তরমুজ’—উপরে সবুজ, ভিতরে লাল।
সব মিলিয়ে, প্রতিপক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরির কৌশল রাজনীতিতে চিরকালীন। পশ্চিমবঙ্গে তার নাম এখন ‘সেটিং’। প্রশ্ন একটাই—এই তত্ত্বে কার ভোট ভাঙবে, আর কার বাক্স ভারী হবে?







