বাংলাদেশের শিক্ষা ও রাজনীতির মঞ্চে ফের তীব্র বিতর্ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণাদায়ী দলিল—সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে দেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ—এ বার পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হল। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে এই ভাষণ অপসারণের খবরে দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠছে: ইতিহাসের কোন অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে, আর কোনটা জানবে না?
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ পাঠ্যবই থেকে ৭ মার্চের ভাষণটি বাদ দেওয়া হয়েছে। গত শিক্ষাবর্ষে যেখানে ১২টি গদ্য পাঠ ছিল, সেখানে এ বার রাখা হয়েছে ১১টি। শুধু অষ্টম শ্রেণি নয়, উচ্চ মাধ্যমিকের ইংরেজি পাঠ্যবই থেকেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংক্রান্ত পাঠ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে যুক্ত করা হয়েছে সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলন নিয়ে একটি নতুন পাঠ, যা নিয়েও শুরু হয়েছে বিস্তর বিতর্ক।


মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর শিক্ষা উপদেষ্টারা পরিকল্পিত ভাবে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে ফেলার পথে এগোচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষকদের মতে, পাকিস্তানপন্থী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে তুষ্ট করতেই ৭ মার্চের ভাষণের মতো ঐতিহাসিক দলিল পাঠ্যক্রম থেকে সরানো হয়েছে—যে ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। এর পর ৮ অগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ১৫ অগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিনে সরকারি ছুটি বাতিল করা হয়, তাঁর নামে থাকা একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয় এবং পাঠ্যবই থেকেও ধাপে ধাপে বঙ্গবন্ধুর নাম ও অবদান কমিয়ে দেওয়া শুরু হয়।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-র এক আধিকারিক জানিয়েছেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে লিখিত নির্দেশ এসেছিল পাঠ্যবইয়ে বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত তথ্য বাদ দেওয়ার জন্য। সেই নির্দেশ মেনেই ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।


শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, ইতিহাসের এমন পুনর্লিখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত প্রেক্ষাপটকে ঝাপসা করে দেবে। অন্য দিকে, সরকারপক্ষের দাবি—পাঠ্যক্রম ‘আধুনিক’ ও ‘সমসাময়িক’ করার লক্ষ্যে এই পরিবর্তন। তবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ঐতিহাসিক দলিল বাদ পড়া যে শুধুই পাঠ্যক্রম সংস্কার নয়, তা মানতে নারাজ সমালোচকেরা।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের পাঠ্যবই থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাদ পড়া শুধু শিক্ষানীতির সিদ্ধান্ত নয়—এটি ইতিহাস, রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে নতুন সংঘাতের সূচনা করল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।







