পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে একটি দলের প্রতীকে জিতে আসা সাংসদরা পরবর্তীতে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে বা দল মিশিয়ে দিতে পারেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। এই পরিস্থিতিতে সংবিধান এবং দলত্যাগ বিরোধী আইন কী বলছে, তা জেনে নেওয়া জরুরি।
ভারতের সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী, কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত সাংসদ বা বিধায়কদের একটি অংশ অন্য কোনও দলে যোগ দিতে পারেন, তবে তার জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’।
আইন অনুযায়ী, কোনও দলের সংসদীয় দলের মোট সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ যদি সম্মিলিতভাবে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বা দল মিশিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেটিকে বৈধ ‘মার্জার’ বা সংযুক্তিকরণ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সাংসদরা দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে রেহাই পেতে পারেন।
তবে যদি দুই-তৃতীয়াংশের কম সদস্য দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দেন, তাহলে বিষয়টি দলত্যাগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে তাঁদের সাংসদ পদ খারিজের আবেদন করা সম্ভব এবং দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় অযোগ্য ঘোষণার প্রশ্ন উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। শুধু সংসদের ভিতরে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখালেই হবে না, মূল রাজনৈতিক সংগঠন বা ‘প্যারেন্ট পার্টি’ ওই সংযুক্তিকরণকে সমর্থন করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, দলের সাংগঠনিক কাঠামোর সম্মতি ছাড়া শুধুমাত্র সাংসদদের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে মূল রাজনৈতিক দলের সামনে একাধিক আইনি পথ খোলা থাকে। প্রথমত, তারা লোকসভার স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের বিরুদ্ধে অযোগ্যতার আবেদন করতে পারে। দল দাবি করতে পারে যে সংশ্লিষ্ট সাংসদরা স্বেচ্ছায় দলের সদস্যপদ ত্যাগ করেছেন এবং দলত্যাগ বিরোধী আইন লঙ্ঘন করেছেন।
স্পিকারের ভূমিকা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্পিকারের সিদ্ধান্তই শেষ কথা নয়। সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘কিহোতো হলোহন’ মামলায় স্পষ্ট করা হয়েছিল যে স্পিকারের সিদ্ধান্ত বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার বাইরে নয়। ফলে স্পিকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি থাকলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যায়।
এছাড়া স্পিকার যদি দীর্ঘদিন সিদ্ধান্ত না নেন, তাহলেও আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে মণিপুরের একটি দলত্যাগ সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে অযোগ্যতার আবেদন জমা পড়ার পর সাধারণত তিন মাসের মধ্যে স্পিকারকে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে।
দলীয় ভাঙনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল দলের নাম ও প্রতীকের অধিকার। কোনও বড় ভাঙনের ঘটনায় মূল দল নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়ে নিজেদের নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক পরিচয়ের ওপর অধিকার দাবি করতে পারে। তবে অতীতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীও দলের প্রতীক ও নামের স্বীকৃতি পেয়েছে।
মহারাষ্ট্রে শিবসেনা এবং জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির ক্ষেত্রে এমন নজির দেখা গিয়েছে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থন পাওয়ার ভিত্তিতে বিদ্রোহী শিবিরকে স্বীকৃতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সব মিলিয়ে, এক দলের প্রতীকে জিতে অন্য দলে যোগ দেওয়া বা দল মিশিয়ে দেওয়া পুরোপুরি অসম্ভব নয়। তবে তার জন্য সংবিধান নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি স্পিকার, নির্বাচন কমিশন ও আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। তাই রাজনৈতিক দলবদলের প্রতিটি ঘটনাই আলাদা করে আইনি পরীক্ষার মুখোমুখি হয়।



