‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কে এবার সরাসরি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশানা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। রবিবার রাজস্থানের চিত্তৌড়গড়ে এক জনসভা থেকে সোনিয়া গান্ধী (Sonia Gandhi)-র বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে শাহ বলেন, স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেস সদর দফতরে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের সময় গান থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই ‘পাপ’ দেশের মানুষ ক্ষমা করবে না।
চিত্তৌড়গড়ের সভা থেকেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান অমিত শাহ। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস সদর দফতরে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের সময় সোনিয়া গান্ধী দলীয় সভাপতিকে তা থামাতে বলেছিলেন। যদিও এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে কংগ্রেস। দলের বক্তব্য, গান থামানোর সঙ্গে সোনিয়ার কোনও সম্পর্ক নেই; অনুষ্ঠানে সঠিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই তিনি কথা বলছিলেন।
শাহ বলেন, কংগ্রেসের সদর দফতরে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হচ্ছিল এবং সেই সময় সোনিয়া গান্ধী দলীয় সভাপতিকে গান থামাতে বলেছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, গোটা ঘটনা দেশবাসী টেলিভিশনে দেখেছেন। এরপরই সোনিয়া গান্ধীকে উদ্দেশ করে তাঁর কড়া মন্তব্য, দেশের ১৪০ কোটি মানুষ তাঁকে দেখছেন এবং এমন ঘটনার জন্য মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
কেবল সোনিয়া গান্ধী নয়, কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কারণে কংগ্রেস ‘বন্দে মাতরম’-কে ভুলে গিয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই গান গাওয়ার জন্য বহু মানুষ ব্রিটিশদের গুলি, লাঠিচার্জ এবং কারাবরণের মুখে পড়েছিলেন বলেও সভায় উল্লেখ করেন তিনি।
অমিত শাহের দাবি, স্বাধীনতার এত বছর পরেও ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতি একই সম্মান থাকা উচিত। কংগ্রেসের কাছে তাঁর আবেদন, এখনও যদি দলের ‘লজ্জাবোধ’ থেকে থাকে, তাহলে দেশবাসীর পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরম’-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (Bankim Chandra Chattopadhyay) অমর আত্মার কাছেও ক্ষমা চাইতে হবে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেস সদর দফতরের অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও ঘিরে। সেখানে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের সময় দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কথাবার্তার দৃশ্য সামনে আসে। এরপর বিজেপি নেতারা অভিযোগ করেন, জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে কংগ্রেস নেতৃত্বের আচরণ প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিজেপির জাতীয় নেতা অমিত মালব্য (Amit Malviya) এই ঘটনাকে আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেন। তাঁর অভিযোগ, ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম অংশগুলি গাওয়ার পর সোনিয়া গান্ধী ‘উত্তেজিত’ হয়ে পড়েন এবং গানটি বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এমনকী রাহুল গান্ধীও (Rahul Gandhi) গান শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে এই দাবিগুলিও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে।
কংগ্রেসের বক্তব্য, গোটা বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে বিজেপি। দলের দাবি, সোনিয়া গান্ধী ‘বন্দে মাতরম’ থামানোর কোনও নির্দেশ দেননি। অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং গান পরিবেশনের সঠিক ব্যবস্থা নিয়ে তিনি কথা বলছিলেন। ফলে বিজেপি যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনও মিল নেই বলেই কংগ্রেসের পাল্টা দাবি।
উল্লেখ্য, ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণাঙ্গ পরিবেশন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। চলতি বছরেও সরকারি অনুষ্ঠানে গানটির পূর্ণাঙ্গ পরিবেশন নিয়ে কংগ্রেসের মধ্যেই মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছিল। কংগ্রেস নেতা শশী থারুর (Shashi Tharoor) পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ বারবার পরিবেশন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পাল্টা বিজেপির দাবি ছিল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের নিয়ম রয়েছে।
এদিনের সভায় ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কের পাশাপাশি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর (Atal Bihari Vajpayee) অবদানও তুলে ধরেন অমিত শাহ। চিত্তৌড়গড়ে ‘অটল গৌরব স্মৃতি সমারোহ’-এ যোগ দিতে গিয়েছিলেন তিনি। নিম্বাহেরায় বাজপেয়ীর ২১ ফুট উচ্চতার মূর্তি উন্মোচন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাজপেয়ীর নেতৃত্বে পোখরান পরমাণু পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মা (Bhajanlal Sharma) এদিন অমিত শাহের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে রাজস্থান উপকৃত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। বামপন্থী উগ্রপন্থা মোকাবিলা এবং নতুন ফৌজদারি আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রেও অমিত শাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান ঘিরে ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্ক নতুন করে বিজেপি-কংগ্রেস রাজনৈতিক সংঘাতকে তীব্র করেছে। অমিত শাহের সরাসরি আক্রমণ এবং কংগ্রেসের পাল্টা ব্যাখ্যায় স্পষ্ট, জাতীয় গানকে ঘিরে এই বিতর্ক শুধু একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা ক্রমেই জাতীয় রাজনীতির বড় ইস্যু হয়ে উঠছে।



