দার্জিলিং পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে এবার বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিল কেন্দ্র। শনিবার সুকনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের (Amit Shah) সঙ্গে পাহাড়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাজ্য সরকারের ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’-এর রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে দার্জিলিংয়ের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, পর্যটন, GTA-র ভূমিকা এবং গোর্খাল্যান্ডের দীর্ঘদিনের দাবির মতো বিষয় উঠে আসে। আলোচনার পর পাহাড়ের সমস্যা নিয়ে কাজ করার জন্য একটি স্থায়ী কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
অমিত শাহের উত্তরবঙ্গ সফরের শেষ দিনে সুকনার একটি হোটেলে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari), দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা (Raju Bista), গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার (GJM) সভাপতি বিমল গুরুং (Bimal Gurung), দলের সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি (Roshan Giri), গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের (GNLF) নেতা মান ঘিসিং-সহ পাহাড়ের একাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কেন্দ্রে রয়েছে পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবি। অতীতে দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল (DGHC) এবং পরে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (GTA) তৈরি করে প্রশাসনিক সমাধানের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যবস্থাগুলি পাহাড়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি। এবার বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’-এর দিকে এগোনোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্থায়ী কমিটি গঠন। দার্জিলিং, ডুয়ার্স ও তরাইয়ের সমস্যা নিয়ে কেন্দ্রের নিযুক্ত প্রতিনিধি পঙ্কজ কুমার সিং (Pankaj Kumar Singh)-কে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তিনি আগে কেন্দ্রের তরফে এই সমস্যাগুলির আলোচনার জন্য interlocutor বা সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
পঙ্কজ কুমার সিংয়ের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে নতুন কমিটি পাহাড়ের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে কাজ করবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কমিটিতে মোট কতজন সদস্য থাকছেন এবং তাঁদের নাম কী, তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
শুধু রাজনৈতিক সমাধান নয়, পাহাড়ের উন্নয়নকেও বৈঠকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পর্যটন শিল্পের উন্নতি, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাহাড়ের যুবক-যুবতীদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
GTA নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। পাহাড়ের উন্নয়নে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়ের কথা উঠে এসেছে। একইসঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, পুরসভা ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও পাহাড়ের প্রতিনিধিদের দাবি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়া স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে সক্রিয় করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাহাড়ের রাজনৈতিক সমাধান যে সাংবিধানিক পথেই হবে, বৈঠকে সেই বার্তা দিয়েছেন অমিত শাহ। অর্থাৎ পৃথক রাজ্যের দাবিকে ঘিরে কোনও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা হবে। পাহাড়ের প্রতিনিধিরাও এই প্রক্রিয়ায় আলোচনার মাধ্যমে এগোনোর বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছেন।
এই বৈঠক রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ আরও একটি কারণে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি পাহাড়ের মানুষের জন্য স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নির্বাচনের পর রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠিত হয়েছে এবং পাহাড়ে বিজেপির জোটসঙ্গী গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাও এখন সেই প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে।
বিমল গুরুং ও রোশন গিরির মতো পাহাড়ের নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দাবি তুলে আসছেন। ফলে অমিত শাহের সঙ্গে সরাসরি ত্রিপাক্ষিক বৈঠককে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এবার সেই দাবিকে আলোচনার নির্দিষ্ট কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ শুরু হল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’ বলতে ঠিক কী ধরনের প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক ব্যবস্থা তৈরি হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পৃথক গোর্খাল্যান্ড, GTA-র পুনর্গঠন কিংবা অন্য কোনও সাংবিধানিক কাঠামো—কোন পথে কেন্দ্র এগোবে, তার বিস্তারিত রূপরেখা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে কমিটির পরবর্তী বৈঠক এবং আলোচনার রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
সব মিলিয়ে, শনিবারের বৈঠককে পাহাড় সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কমিটির নেতৃত্বে পঙ্কজ কুমার সিং এবং কেন্দ্র-রাজ্য-পাহাড়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আলোচনার এই প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তব সমাধানের দিকে এই ‘শাহী নকশা’ কতটা এগোয়, নজর থাকবে পাহাড়বাসীর।



