তারাতলা বিপর্যয়ের পর রাজ্যের নিজস্ব বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নিল সরকার। রবিবার গার্ডেনরিচে নতুন বাহিনীর নাম ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। এনডিআরএফ (NDRF)-এর ধাঁচে তৈরি হতে চলেছে ‘অর্জুন বাহিনী’। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই এই বাহিনীর কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সৈনিক বোর্ডের মাধ্যমে ২০০ জন দক্ষ কর্মীকে নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে বাহিনীতে অগ্নিবীরদের জন্য ২০ শতাংশ সংরক্ষণ থাকবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
নতুন বাহিনীকে মূলত বিভিন্ন ধরনের বিপর্যয়ের সময় দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণকাজে ব্যবহার করা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে বাড়ি বা বহুতল ভেঙে পড়া, বড় দুর্ঘটনা কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষিত সদস্যদের মোতায়েন করা হবে। অত্যাধুনিক উদ্ধারকারী সরঞ্জাম দিয়ে বাহিনীকে সাজানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রথম দফায় নিয়োগ হতে চলা ২০০ জনকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ভাগ করে রাখা হবে। তাঁদের মধ্যে ১০০ জন থাকবেন কলকাতায়। আরও ৫০ জনকে রাখা হবে দার্জিলিংয়ে এবং বাকি ৫০ জনকে সাগর-কাকদ্বীপ এলাকায় মোতায়েন করা হবে। ফলে মহানগর, পাহাড় এবং উপকূল—তিন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেই দ্রুত উদ্ধারকারী দল পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামো তৈরি হবে।
অগ্নিবীরদের নিয়ে সরকারের আলাদা পরিকল্পনাও রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী বছরের জানুয়ারির আগে অগ্নিবীরদের পাওয়া সম্ভব নয়। সেই কারণে আপাতত সৈনিক বোর্ডের মাধ্যমে দক্ষ ২০০ জনকে নিয়ে বাহিনীর কাজ শুরু করা হবে। পরে অগ্নিবীরদের এই বাহিনীতে যুক্ত করা হবে।
শুধু ‘অর্জুন বাহিনী’ নয়, রাজ্যের অন্যান্য জরুরি পরিষেবাতেও অগ্নিবীরদের জন্য সংরক্ষণের ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ, বন দফতর এবং দমকলেও অগ্নিবীরদের জন্য ২০ শতাংশ চাকরি সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে প্রশিক্ষিত অগ্নিবীরদের রাজ্যের নিরাপত্তা ও বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন বাহিনী তৈরির সিদ্ধান্তের পিছনে তারাতলা বিপর্যয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, তারাতলায় একটি ভবন ভেঙে পড়ার পর উদ্ধারকাজে এনডিআরএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে ২২ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি, কলকাতার মতো বড় শহরে কোনও বড় বিপর্যয় ঘটলে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর নির্ভর করে থাকা যথেষ্ট নয়। রাজ্যের নিজেরও অত্যাধুনিক প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বাহিনী থাকা প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন থেকেই ‘অর্জুন বাহিনী’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় বিল্ডিং এবং ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মোতায়েনের পাশাপাশি আধুনিক উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি রাখা হবে। বাহিনীতে যাঁদের নেওয়া হবে, তাঁদের প্রত্যেকেরই বিপর্যয় মোকাবিলার কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শহরের পাশাপাশি দার্জিলিং ও সাগর-কাকদ্বীপে বাহিনীর সদস্য রাখার সিদ্ধান্তের পিছনেও রয়েছে ভিন্ন ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা। কলকাতায় মূলত বহুতল বা পরিকাঠামোগত দুর্ঘটনা মোকাবিলা, পাহাড়ে ভূমিধস বা অতিবৃষ্টিজনিত বিপর্যয় এবং উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা বন্যার মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এদিন আগের সরকারের বিরুদ্ধেও সরব হন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রের তরফে বরাদ্দ অর্থ আগের সরকার যথাযথ ভাবে ব্যবহার করেনি। বর্তমান সরকার সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে রাজ্যের দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকাঠামোকে আরও আধুনিক করার উদ্যোগ নেবে বলে জানান তিনি।
ফলে সেপ্টেম্বর থেকে ২০০ জনকে নিয়ে ‘অর্জুন বাহিনী’র প্রাথমিক যাত্রা শুরু হলেও ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অগ্নিবীরদের অন্তর্ভুক্তি এবং পুলিশ, বন ও দমকলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর হলে রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা ও জরুরি পরিষেবা ব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত জনবলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়তে পারে। তারাতলার ঘটনার পর এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা দ্রুত কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর।



