ছাদে বাবা, সিঁড়িতে মা-মেয়ে, খাটের নীচে ছেলে! রংপুরে হিন্দু শিক্ষকের পরিবারের রহস্যমৃত্যু

রংপুরে তালাবন্ধ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানের দেহ উদ্ধার। ছাদ, সিঁড়ি ও খাটের নীচে দেহ মেলায় রহস্য ঘনীভূত, পরে গ্রেপ্তার দু’জন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বাংলাদেশের রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত এক হিন্দু স্কুলশিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানের রহস্যমৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। শনিবার রাতে একটি তালাবন্ধ বাড়ি থেকে পরিবারের চার সদস্যের দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অবসরপ্রাপ্ত রংপুর জেলা স্কুলের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী এবং ১২ বছরের ছেলে প্রিয়মের দেহ বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার হয়। গলায় ফাঁসের চিহ্ন-সহ একাধিক অসঙ্গতি সামনে আসায় ঘটনাটিকে নিছক স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে করছে না পুলিশ।

রংপুর শহরের কামাল কাছনা-মাছুয়াপাড়া এলাকার বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। শনিবার রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ পুলিশ বাড়ির দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে চারটি দেহ উদ্ধার করে। আত্মীয়দের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ কয়েক দিন ধরে বিচ্ছিন্ন ছিল। বাড়ি অন্ধকার এবং তালাবন্ধ দেখে সন্দেহ হয় তাঁদের। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বয়স ৬৫ বছর। তিনি রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতার বয়স ৫০ বছর। তাঁদের মেয়ে আগামী এবং ১২ বছরের ছেলে প্রিয়মও এই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মেয়ের বয়স নিয়ে সামান্য পার্থক্য থাকলেও চারজনের পরিচয় সম্পর্কে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে মোটের উপর একই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

ঘটনাস্থলে দেহ উদ্ধারের ধরনও তদন্তকারীদের নজর কেড়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গণপতির দেহ পাওয়া যায় বাড়ির ছাদে। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা এবং মেয়ে আগামীকে ছাদে ওঠার সিঁড়ির কাছে পাওয়া যায়। অন্যদিকে ১২ বছরের প্রিয়মের দেহ উদ্ধার হয় একটি খাটের নীচ থেকে। এই অস্বাভাবিক অবস্থানই মৃত্যুর নেপথ্যে কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।

প্রাথমিক তদন্তে চারজনের শরীরেই গলায় কিছু জড়ানোর চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে শ্বাসরোধের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

প্রথম দিকে ডাকাতির সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় ছিল। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কী কী আলামত পেয়েছে, বাড়িতে জোর করে প্রবেশের চিহ্ন ছিল কি না এবং পরিবারের কোনও সম্পত্তি বা মূল্যবান সামগ্রী নিখোঁজ হয়েছে কি না—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা পারিবারিক কোনও কারণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।

পরিবারের আত্মীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেলের পর থেকে তাঁদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর পরিবারের সদস্যদের ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত শনিবার রাতে আত্মীয়রা বাড়িতে এসে দেখেন, বাড়িটি তালাবন্ধ এবং ভিতরে কোনও সাড়াশব্দ নেই। পুলিশ এসে দরজা খুলতেই ভয়াবহ দৃশ্য সামনে আসে।

এই ঘটনায় তদন্তে নেমেছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং সিআইডি। ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ফরেন্সিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। দেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারীরা মৃত্যুর আনুমানিক সময়, চারজনের শেষ অবস্থান এবং তাঁদের সঙ্গে কারও কোনও বিরোধ ছিল কি না, সেই তথ্যও খতিয়ে দেখছেন।

তবে রবিবারের পরবর্তী তদন্তে ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদের সাংবাদিক বৈঠকে দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই ঘটনায় দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের এই দাবি সামনে আসায় প্রাথমিক ভাবে যে ডাকাতি বা পারিবারিক ঘটনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছিল, তদন্ত এখন অন্য দিকে মোড় নিয়েছে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত এবং হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ ক্রম কী ছিল, তা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া এগোনোর সঙ্গে আরও স্পষ্ট হবে।

রংপুরের এই ঘটনায় একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু ঘিরে ইতিমধ্যেই গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও তাঁর ১২ বছরের ছেলের মৃত্যু এবং বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে দেহ উদ্ধারের ঘটনা প্রথম থেকেই রহস্য তৈরি করেছিল। এখন পুলিশের নতুন দাবির পর তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রয়েছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর