স্থানীয় বাঙালি ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার, বদলের বাংলায় নতুন শিল্পনীতির বার্তা অর্থমন্ত্রীর

মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে স্থানীয় বাঙালি ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার, বড় বিনিয়োগে দেশি-বিদেশি সংস্থার জন্য দরজা খোলা—নতুন শিল্প-বাণিজ্য নীতিতে এমনই পরিকল্পনার কথা জানাল রাজ্য সরকার।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বড় শিল্পে দেশি-বিদেশি এবং ভিন্‌রাজ্যের সংস্থাকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলেও মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে স্থানীয় বাঙালি ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিল রাজ্য সরকার। শনিবার বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিলের বার্ষিক কনক্লেভে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত (Swapan Dasgupta) জানান, রাজ্যের নতুন শিল্প-বাণিজ্য নীতিতে স্থানীয় উদ্যোগপতিদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প, বিনিয়োগ, জমি ও ইনসেনটিভ নীতি সমন্বয় করে দ্রুত চূড়ান্ত করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ, নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ী এবং প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেট অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। শিল্প-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, রাজ্যে বড় বিনিয়োগের দরজা সবার জন্য খোলা থাকবে।

তবে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্যোগপতিদের গুরুত্ব দেওয়ার কথা আলাদা করে জানান তিনি। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় ভাবে গড়ে ওঠা উদ্যোগে ‘রেজিস্টার্ড বাঙালি ব্যবসায়ী’দের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা, এর অর্থ এই নয় যে বড় শিল্পে বাইরের সংস্থার প্রবেশ বন্ধ হবে। বরং বড় বিনিয়োগ এলে তার সুফল রাজ্য ও স্থানীয় ব্যবসায়ী—দুই পক্ষই পেতে পারে।

স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের বহু উদ্যোগপতির ক্ষেত্রে পুরনো বকেয়া বা আটকে থাকা প্রকল্প রয়েছে। কোনও কোনও প্রকল্প মাঝপথে গিয়ে থমকে রয়েছে। সেই সমস্যাগুলি ধাপে ধাপে মেটানোর পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার।

বিগত সরকারের নীতির সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রীর দাবি, কোনও উদ্যোগপতির প্রকল্প মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে তার ‘রেট্রোস্পেক্টিভ এফেক্ট’ পড়ত। পুরনো প্রকল্পের ক্ষেত্রেও বকেয়া থেকে যেত। তাঁর বক্তব্য, সরকার সেই বকেয়া মেটানোর উদ্যোগ নেবে। প্রথম পর্যায়ে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোগপতিদের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

অর্থমন্ত্রীর মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এই ক্ষেত্রটি দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলার শিল্প কাঠামোও সমস্যায় পড়বে। তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পুরনো সমস্যা মেটানোর পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।

শহর ও শহরতলিতে নতুন শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘আরবান ল্যান্ড সিলিং’ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে এই ব্যবস্থা আগেই চালু হয়েছে বলে উল্লেখ করে বাংলাতেও তা কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

তবে নতুন শিল্প-বাণিজ্য নীতি ঘোষণার সময়সীমা নিয়ে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ১৫ অগস্টের মধ্যে নীতি ঘোষণার পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হওয়ায় তা পিছিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বপন দাশগুপ্ত। তাঁর বক্তব্য, ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিল্প-বাণিজ্য নীতি ঘোষণা করার চেষ্টা করছে রাজ্য।

জমি নীতি নিয়েও নতুন ভাবনার কথা সামনে এসেছে। পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষের প্রস্তাব, কোনও শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য যে ব্যক্তির কাছ থেকে জমি নেওয়া হবে, তাঁকে শুধু জমির মূল্য দিয়ে বিষয়টি শেষ না করে সংশ্লিষ্ট শিল্পের অংশীদার বা ‘স্টেকহোল্ডার’ করার কথা ভাবতে হবে।

শুধু তাই নয়, জমিদাতার পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে সংশ্লিষ্ট শিল্পে চাকরির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের বিবেচনা করা উচিত বলে মত শংকর ঘোষের। সরকারের এই ভাবনা কার্যকর হলে শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ বা জমি নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাজ্য সরকারের শিল্পনীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই একই সঙ্গে দুই ধরনের বার্তা রয়েছে। একদিকে বড় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টানার দরজা খোলা রাখা, অন্যদিকে স্থানীয় বাঙালি ব্যবসায়ী এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শিল্প, জমি, বিনিয়োগ ও ইনসেনটিভ নীতি পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হলে বাংলায় নতুন করে শিল্প-বাণিজ্যের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে বলে সরকারের আশা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন