দেশের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে এবার দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনের ডাক দিলেন আধাসেনার অবসরপ্রাপ্ত জওয়ানরা। কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (CAPF)-এর প্রাক্তন কর্মীদের সংগঠন ‘এক্স প্যারামিলিটারি ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর বিভিন্ন শাখা আগামী ১২ নভেম্বর থেকে অনশন কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা করেছে। তাঁদের মূল দাবি, ‘CAPF (General Administration) Act, 2026’ বাতিল করা এবং পুরনো পেনশন ব্যবস্থা (OPS) পুনর্বহাল করা।
অবসরপ্রাপ্ত আধাসেনা কর্মীদের অভিযোগ, ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নতুন আইনের ফলে কেন্দ্রীয় বাহিনীগুলির শীর্ষস্তরে ডেপুটেশনে থাকা আইপিএস (IPS) আধিকারিকদের প্রভাব আরও বাড়বে। তাঁদের দাবি, এর ফলে বাহিনীর নিজস্ব ক্যাডারের আধিকারিকদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পেনশন সংক্রান্ত দাবিও পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।
‘এক্স প্যারামিলিটারি ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রধান রণবীর সিংয়ের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অবসরপ্রাপ্ত আধাসেনা কর্মীদের বিভিন্ন দাবি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কার্যকর কোনও সমাধান হয়নি। তাই এবার আন্দোলনের পথে যাওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প তাঁদের হাতে নেই বলে দাবি তাঁর।
নতুন আইনটিকে ‘কালো আইন’ বলে অভিহিত করে রণবীর সিং জানিয়েছেন, এটি বাতিল এবং পুরনো পেনশন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতেই ১২ নভেম্বর থেকে যন্তর মন্তরে অনশন করবেন তাঁরা। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)-কেও আগে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি সংগঠনের। তবে সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ।
অবসরপ্রাপ্ত আধাসেনা কর্মীদের আরও অভিযোগ, বাহিনীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার পরিবর্তে ডেপুটেশনে আসা আমলাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে কর্মরত জওয়ান ও আধিকারিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন বাহিনীতে কাজ করে অর্জন করা অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন না হলে কর্মীদের আত্মসম্মান ও পেশাগত মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন আইনে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ পদগুলিতে আইপিএস আধিকারিকদের নিয়োগের বিষয়ে বিধিবদ্ধ কাঠামো তৈরি হয়েছে বলে সংগঠনের অভিযোগ। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, CAPF-এর আইজি পদগুলির ৫০ শতাংশ আইপিএস আধিকারিকদের জন্য নির্দিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এডিজি স্তরেও ডেপুটেশনে থাকা আইপিএস আধিকারিকদের নিয়োগের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া স্পেশাল ডিজি এবং ডিজি-র মতো শীর্ষ পদগুলির ক্ষেত্রেও আইপিএস ক্যাডারের আধিকারিকদের নিয়োগের বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে সংগঠনের দাবি। গ্রুপ এ CAPF আধিকারিকদের জন্য ডিআইজি পদে আগে যে সীমাবদ্ধতা ছিল, নতুন আইনে সেটিও বদলানো হয়েছে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের।
অবসরপ্রাপ্ত আধাসেনা কর্মীদের বক্তব্য, আগে ডেপুটেশনে আইপিএস আধিকারিকদের নিয়োগের বিষয়গুলি মূলত প্রশাসনিক বা নির্বাহী নির্দেশের মাধ্যমে পরিচালিত হত। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থাকে বিধিবদ্ধ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বাহিনীর নিজস্ব ক্যাডারের আধিকারিকদের পদোন্নতির পথ আরও সংকুচিত হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
এই আইনের বিরুদ্ধে সংগঠনটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) আগে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীতে আইপিএস আধিকারিকদের ডেপুটেশন ধাপে ধাপে কমানোর বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছিল। বিএসএফ, সিআরপিএফ, সিআইএসএফ, আইটিবিপি এবং এসএসবি—এই পাঁচ বাহিনীতে আইজি স্তর পর্যন্ত ডেপুটেশন কমানোর পাশাপাশি ক্যাডার পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সংগঠনের দাবি।
অবসরপ্রাপ্ত আধাসেনা কর্মীদের অভিযোগ, আদালতের সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের পরিবর্তে নতুন আইন এনে ডেপুটেশনে থাকা আইপিএস আধিকারিকদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এর ফলে CAPF-এর নিজস্ব ক্যাডারের আধিকারিকদের মধ্যে পদোন্নতি এবং নেতৃত্বের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তবে নতুন আইনের প্রকৃত প্রশাসনিক প্রভাব এবং আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে আইনি ও সরকারি অবস্থানই চূড়ান্ত বিষয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগকে সেই প্রেক্ষিতেই দেখা প্রয়োজন। আপাতত অবসরপ্রাপ্ত আধাসেনা কর্মীদের ঘোষিত ১২ নভেম্বরের অনশন কর্মসূচি কেন্দ্রের উপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে।
দেশের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন কাজ করা প্রাক্তন জওয়ানদের পেনশন, পদোন্নতি কাঠামো এবং CAPF-এর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষোভ এবার প্রকাশ্য আন্দোলনের রূপ নিতে চলেছে। ১২ নভেম্বর যন্তর মন্তরে তাঁদের কর্মসূচি কতটা বড় আকার নেয় এবং কেন্দ্র কী প্রতিক্রিয়া জানায়, এখন সেদিকেই নজর।



