ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) কীভাবে হওয়া উচিত, আর বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গে কী হচ্ছে— এই দুইয়ের ফারাক নিয়েই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তাঁর আশঙ্কা, তাড়াহুড়ো করে চালানো এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ভিতকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের SIR প্রক্রিয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই প্রশ্ন তুলেছিলেন— “২-৩ মাসে কীভাবে পুরো ভোটার তালিকা ঠিক করা সম্ভব?” সেই সুরেই এবার PTI-কে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন জানালেন, ভোটার তালিকা সংশোধন জরুরি হলেও তার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সংবেদনশীল পদ্ধতি অপরিহার্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তা মানা হচ্ছে না বলেই তাঁর অভিযোগ।


৯২ বছর বয়সি এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদ বর্তমানে বস্টনে থাকেন। সেখান থেকেই তিনি জানালেন, SIR-এ ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে ‘বেসলাইন’ ধরা হলেও সকলকেই নতুন করে ফর্ম পূরণ করতে হচ্ছে। নথিতে সামান্য গরমিল থাকলেই ডাকা হচ্ছে শুনানিতে। আশ্চর্যের বিষয়, সেই তালিকায় নাম উঠেছে অমর্ত্য সেনেরও। তাঁর কথায়, “আমার মৃত মায়ের বয়স নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, যদিও তিনি নিজেও নিয়মিত ভোট দিতেন এবং সমস্ত তথ্য কমিশনের কাছেই রয়েছে।”
গ্রামে জন্ম নেওয়া বহু মানুষের কাছেই জন্মসনদের মতো নথি নেই— এই বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দেন অমর্ত্য। শান্তিনিকেতনের গ্রামে জন্মানো এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “আমার মতো অনেকেরই বার্থ সার্টিফিকেট নেই। আমাকেও অতিরিক্ত নথি জোগাড় করতে হয়েছে।” বিটলস-এর গান With a Little Help from My Friends উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, বন্ধুদের সাহায্যে তিনি পার পেরেছেন, কিন্তু যাঁদের সেই সহায়তা নেই, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েই তাঁর দুশ্চিন্তা।
বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। যদিও অমর্ত্য সেন সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে ঢুকতে চাননি। তাঁর বক্তব্য, “আমি নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ নই। কে লাভবান হচ্ছে জানি না। শুধু চাই, আমাদের গর্বের গণতন্ত্রে যেন দাগ না পড়ে।” তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষ, মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের পক্ষেই প্রয়োজনীয় নথি জোগাড় করা সবচেয়ে কঠিন। ফলে তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কাও সবচেয়ে বেশি।


এই প্রসঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কথা টেনে অমর্ত্য বলেন, রবীন্দ্রনাথ নিজেকে হিন্দু, মুসলিম ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির মিলিত ফসল বলে গর্ব করতেন। আজকের ভারতে সেই বহুত্ববাদী চেতনাকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলেই তাঁর ইঙ্গিত।







