নজরবন্দি ব্যুরো: পঞ্চায়েত ভোট, পঞ্চায়েত ভোট, পঞ্চায়েত ভোট। বিগত বেশ কয়েকমাস ধরে পশ্চিমবঙ্গের হাওয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এই শব্দবন্ধদুটি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল প্রত্যেক সচেতন নাগরিক, থুড়ি ভোটারের কাছে একথা বোধ হয় স্পষ্ট যে, বিধানসভা ভোট জিতে কুর্শি দখলের পর পঞ্চায়েত বা পৌরসভার ভোট নিয়ে সেই সংশ্লিষ্ট শাসক দল খুব একটা উদগ্রীবতা দেখান না। সময়ের চলন বুঝে, পরিস্থিতি নিরিখ করে, সর্বোপরি নিজেদের জয়কে কার্যত সুনিশ্চিত পর্যায়ে উত্তীর্ণ করে একেবারে মোক্ষম টাইমিংয়ে জানানো হয় গ্রামোন্নয়ন প্রতিনিধিদের সু-নির্বাচনের সময়কাল!
আরও পড়ুন:সর্বহারার দল করে দামি গাড়ি কেনা মহাপাপ! কোন নেতাকে বহিষ্কার করল সিপিএম?



সেই সব মেনেই রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত আগামী ৮ই জুলাই হবে পঞ্চায়েত ভোট। একদিনেই। প্রসঙ্গত, টানা তৃতীয়বারের জন্য বিধানসভা ভোটে জিতে বাংলার মসনদ আলো করে বসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে ক্ষমতার দখল থেকে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস দলের হাতেই। এরপর কলকাতা পুরসভা নির্বাচন কিংবা কিছু উপনির্বাচনেও জারি থেকেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের রমরমা। বলাই বাহুল্য, সেই সময়ও পুরসভা ভোটের নির্দিষ্ট সময়সীমা পেরিয়ে গিয়েই ভোট করানো সম্ভব হয়েছিল। আগেই যে কথাটি বললাম, মন্ত্র একটাই: আগে আসল সিংহাসন দখল করো, তারপর অতি সাবধানতা অবলম্বন করে বাকী ভোট জিতে নাও। শুধু এ রাজ্যেই নয়, এই মন্ত্র এখন দেশ জুড়েই জনপ্রিয়, বোধহয় কার্যকরীও বটে।
তৃতীয়বার বিধানসভা ভোটে জয় পেলেও ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই ফাঁস হতে থাকে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক কেচ্ছা। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির জেরে জেলে যেতে হয়েছে রাজ্যের খোদ শিক্ষামন্ত্রী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে। শহরের আনাচে কানাচে থেকে উদ্ধার হয়েছে কোটি কোটি টাকা। বাঙালি মধ্যবিত্ত চোখ ছানাবড়া করে সেই খবর দেখেছে, ঈর্ষায় কপাল চাপড়েই খান্ত থেকেছে ক্ষণিকে। কোনো সন্দেহ নেই পার্থ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এককালের বিশ্বস্ত সৈনিক। দুর্নীতিতে যুক্ত হয়ে পড়া পার্থকে দল থেকে বাদ দিয়েছে তৃণমূল।

শুধু তো পার্থবাবু নন, গ্রেফতার হয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি মানিক ভট্টাচার্য। অন্যদিকে, গরুপাচার মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন বীরভূমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা অনুব্রত মণ্ডল। নানান দুর্নীতি সূত্রে উঠে এসেছে একাধিক নাম: সৎ রঞ্জন, কালীঘাটের কাকু ইত্যাদি। শহিদ মিনারের পাশে বঞ্চিত চাকরীপ্রার্থীদের আন্দোলন হাজার দিন ছাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষমতায় এসে এবার একেবারেই স্বস্তিতে নেই তৃণমূল কংগ্রেস। সেই মুহূর্তে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করতে করতেই বেজে গেল পঞ্চায়েত ভোটের দামামা। কিন্তু মানুষের মনে যে বিরূপ ধারণা তৈরী হয়েছে তৃণমূল সম্পর্কে তা ভাঙবে কে? মানুষের মন ভাঙানো যে চাট্টিখানি কথা নয় তা সব রাজনৈতিক নেতাই বোঝেন।


তৃণমূলের পক্ষে সুখ এই যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও যথেষ্ট লোকপ্রিয় নেত্রী। কিন্তু মমতার পাশে থেকে যে নেতার উত্থান, অর্থাৎ, উত্তরাধিকার সূত্রে যিনি দলের পরবর্তী মুখ হয়ে উঠবেন, তৃণমূলের সেকেণ্ড-ইন-কম্যাণ্ড সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দায়িত্ব নিলেন নিজে। পঞ্চায়েত ভোটে নিজের দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া শুধু নয়, তৃণমূল কংগ্রেসকে পঞ্চায়েত ভোট উৎরে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন অভিষেক। শুরু করলেন একটি যাত্রা, নাম দিলেন ‘নবজোয়ার’।
জনতার দরবারেবিগত ৬০ দিন ধরে বছর পঁয়ত্রিশের অভিষেক হাঁটলেন ৪৫ হাজার কিলোমিটার। ছুঁয়ে দেখলেন জেলা ৩৩ টি জেলা। করলেন ১৩৫ টি জনসভা, ১২৫ টি রোড শো। যে যাত্রা শুরু হয়েছিল কোচবিহার থেকে তা শেষ হল এসে কাকদ্বীপে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাশের দাঁড়ালেন। প্রশংসাও করলেন। যেখানে বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেতাদের দেখলে রাস্তাঘাটে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিচ্ছে মানুষ, সেই সময়ই কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছাবার ঝুঁকিটি নিলেন যুব নেতা। তাঁর পিছনে হাঁটলেনও হাজার হাজার মানুষ। কালো গাড়ির ছাদে উঠে আধুনিক রাজনীতির ফ্যাশানে দিলেন ঝাঁঝালো বক্তৃতা। অভিষেক ঘামলেন। অভিষেক হাঁটলেন। পেলেন মানুষের হাতের ছোঁয়া নিজের হাতে। হাত ছড়ল করমর্দন করতে করতে। রাজনীতিতে বহুদিন এসেও অবশেষে পেলেন ‘উন্ডস অফ লাভ’।
অভিষেকের নিজের জীবনেও কি খুব সুস্থির আছেন? বারংবার কয়লা পাচার মামলায় তাঁকে হাজিরা দিতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় গোয়ান্দা সংস্থার ঘরে। নয় ঘন্টা জেরার মুখোমুখি হয়েও বজায় রাখছেন গলার জোর। তাঁর স্ত্রী রুজিরা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তলব করা হয়েছে অনেকবার। উঠে এসেছে তাঁদের কোম্পানি ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’-এর নামও। সব মিলিয়ে জর্জরিত জীবনেও অভিষেক চেষ্টা করলেন। রাজনীতির ইতিহাসে এই নবজোয়ার থাকবে কিনা জানি না, তবে পরিস্থিতকে আঁচ করে তিনি নিজে যে টুকু করতে পারলেন করলেন। বিরোধী দলেরা অবশ্য অভিষেকের ‘নবজোয়ার’ যাত্রাকে একেবারেই গুরুত্ব দিতে নারাজ। এখন, দুর্নীতির আবহে কতটা লড়াই দেবে অভিষেকের এই যাত্রা তা অবশ্য সময় জানান দেবে।
দুর্নীতির আবহে পঞ্চায়েত ভোট, বিরুদ্ধে কতটা লড়াই দেবে অভিষেকের নবজোয়ার?








