বিধানসভার সই-বিতর্ক মামলায় সিআইডির জেরার মুখোমুখি হতে রবিবার নির্ধারিত সময়ের আগেই ভবানী ভবনে পৌঁছে গেলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ মেনে তদন্তে সহযোগিতা করতে হাজির হন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। একই মামলায় বিকেলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষকেও।
রবিবার দুপুর ১২টায় সিআইডি দফতরে হাজিরার নির্দেশ ছিল অভিষেকের। তবে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৭ মিনিট আগে, সকাল ১১টা ৪৩ মিনিট নাগাদ তাঁর গাড়ি ভবানী ভবনে পৌঁছয়। দফতরে ঢোকার আগে নিয়ম মেনে পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে হাজিরার খাতায় স্বাক্ষর করেন তিনি। এরপর তদন্তকারী আধিকারিকদের সামনে উপস্থিত হন তৃণমূল সাংসদ।
অভিষেকের আগমনকে কেন্দ্র করে ভবানী ভবন চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো। ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও সকাল থেকেই সিআইডি আধিকারিকেরা দফতরে পৌঁছে যান। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং র্যাফ।

এই মামলায় এর আগেও গত বৃহস্পতিবার দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন অভিষেক। দিল্লি থেকে ফিরে তিনি সরাসরি সিআইডি দফতরে যান। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরার পর রাতের দিকে বেরিয়ে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে যান তিনি। সেদিনই তদন্তকারীরা তাঁকে দ্বিতীয়বার হাজিরার নোটিস দেন।
অন্যদিকে, সই-বিতর্ক মামলার তদন্তে রবিবার বিকেলে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষকেও তলব করেছে সিআইডি। ফলে এই মামলার তদন্ত নতুন মাত্রা পাচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
শুধু এই মামলাই নয়, আগামী ১৬ জুন একটি পৃথক মামলায়ও অভিষেককে হাজিরার নির্দেশ দিয়েছে সিআইডি। তাঁর একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া অভিযোগের তদন্তে এই তলব। সম্প্রতি তাঁর কালীঘাটের বাসভবনে গিয়ে নোটিসও ধরিয়ে আসে গোয়েন্দারা। পাশাপাশি, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ১৫ জুন তাঁকে তলব করেছে ইডি। ফলে পরপর তিন দিন বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের বিষয়ে স্পিকারকে দেওয়া তৃণমূল পরিষদীয় দলের একটি চিঠি ঘিরেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। অভিযোগ ওঠে, ওই চিঠিতে থাকা একাধিক স্বাক্ষরে অসঙ্গতি রয়েছে। কয়েকজন বিধায়ক দাবি করেন, তাঁদের স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে। কোথাও আবার নাম লেখা হয়েছে ব্লক লেটারে। সেই চিঠিতে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরও ছিল।
এই কারণেই তাঁকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল সিআইডি। প্রথম দিকে তিনি হাজিরা এড়িয়ে গেলেও পরে আইনি সুরক্ষা চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালতের নির্দেশের পরই তদন্তে সহযোগিতা করতে ভবানী ভবনে হাজিরা দেওয়া শুরু করেন তিনি।
এর মধ্যেই শনিবার গভীর রাতে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুমিত রায়কে খুঁজতে তাঁর কালীঘাটের বাসভবনে পৌঁছয় শালবনি থানার পুলিশ। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, সুমিতের মোবাইল ফোনের শেষ টাওয়ার লোকেশন ওই বাড়ির আশপাশে পাওয়া গিয়েছিল। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পর সাড়া না মেলায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সহায়তায় বাড়ির তালা ভেঙে তল্লাশি চালানো হয়। তবে তল্লাশিতে কোনও কিছু বাজেয়াপ্ত করা হয়নি এবং সুমিত রায়েরও খোঁজ মেলেনি। ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
ক্রমশ একাধিক তদন্তের চাপ বাড়ছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর। সই-বিতর্ক মামলা, বিতর্কিত মন্তব্য সংক্রান্ত অভিযোগ এবং নিয়োগ দুর্নীতি তদন্ত—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক দিন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।



