ব্রিটিশ ঐতিহ্যকে বিদায়! ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নতুন ড্রেস কোড, বদল একাধিক নিয়মে

‘আর্মি ইউনিফর্মস-২০২৬’ ম্যানুয়ালে সেনার পোশাক, সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিক নিয়মে বড় পরিবর্তন। বাদ পড়ছে একাধিক ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্য।

বিজ্ঞাপন
নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে শুরু হল নতুন অধ্যায়। ঔপনিবেশিক আমলের একাধিক পোশাকবিধি ও আনুষ্ঠানিক রীতিকে ধাপে ধাপে বিদায় জানিয়ে সেনাবাহিনীতে চালু করা হল নতুন ড্রেস কোড। ‘আর্মি ইউনিফর্মস-২০২৬’ নামে প্রকাশিত নতুন নির্দেশিকায় পোশাক, সাজসজ্জা এবং ব্যক্তিগত উপস্থিতি সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে।

ভারতীয় সেনার তরফে প্রকাশিত ১৭৪ পাতার এই ম্যানুয়ালে পোশাক সংক্রান্ত নতুন নিয়মাবলির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেনা সূত্রের দাবি, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পরিবর্তনগুলি আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর সেনাবাহিনীর পোশাকবিধি নিয়ে এত বিস্তৃত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হল।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফর্মাল অনুষ্ঠানে সেনা অফিসাররা এবার ফুলহাতা শার্টের উপর গলা বন্ধ কোট বা জ্যাকেট পরতে পারবেন। এতদিন এই ধরনের পোশাকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল না। কোট বা জ্যাকেট যে কোনও মার্জিত রঙের হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে শীতকালীন পোশাকেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। অ্যাঙ্গোলা শার্ট, ব্যাটল জ্যাকেট এবং বেরেট টুপিকে নতুন শীতকালীন পোশাকের অংশ করা হয়েছে।

মহিলা সেনা অফিসারদের পোশাকবিধিতেও এসেছে নতুন নির্দেশ। আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে মার্জিত রঙের শাড়ি অথবা কুর্তা-সালোয়ার ও গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা প্যান্টের সঙ্গে দোপাট্টা পরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে স্লিভলেস কুর্তা, পালাজো, সিগারেট প্যান্টসহ অন্যান্য ক্যাজুয়াল পোশাক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশিকায় বেশ কিছু ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যবাহী উপকরণও বাদ দেওয়া হয়েছে। মেস ড্রেস নম্বর ৫ এবং ৬ থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে পাউচ বেল্ট বা চামড়ার কোমরবন্ধনী। সাধারণত রাষ্ট্রপতি ভবন, রাজভবন বা উচ্চপর্যায়ের সরকারি নৈশভোজে এই বেল্ট ব্যবহার করা হতো। যদিও কিছু বিশেষ রেজিমেন্টের কর্নেল পদমর্যাদার অফিসারদের জন্য এই নিয়মে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

শুধু পোশাক নয়, সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত পরিভাষাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ‘রয়্যাল’সহ ব্রিটিশ আমলের একাধিক শব্দ সেনার অভিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভারতীয়করণের প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সেনাকর্মীদের ব্যক্তিগত সাজসজ্জা সম্পর্কেও কড়া নির্দেশ জারি হয়েছে। ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় শরীরে ট্যাটু প্রদর্শন, গয়না বা অলংকার পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিনে হাতে কেবল একটি সুতো বা ধাগা পরার অনুমতি থাকবে। ব্রেসলেট পরার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

শিখ ধর্মাবলম্বী সেনাকর্মীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধর্মীয় পরিচয়ের নিয়ম বহাল থাকলেও অন্যদের জন্য কোনও ধর্মীয় প্রতীক প্রকাশ্যে প্রদর্শনের অনুমতি থাকবে না। সেনাবাহিনীর অভিন্ন ও পেশাদার পরিচয় বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নতুন ম্যানুয়ালে পুরুষ সেনাকর্মীদের গোঁফের দৈর্ঘ্য নিয়েও নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ১২ সেন্টিমিটারের বেশি গোঁফ রাখা যাবে না। পাশাপাশি ডিওডোরেন্ট বা পারফিউম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আফটার-শেভ লোশন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মহিলা সেনাকর্মীদের ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। লিপস্টিক, নেলপলিশ, টিপ বা নাকছাবি পরা যাবে না। তবে সিঁদুর ব্যবহারের অনুমতি থাকছে। শর্ত একটাই—সেটি এমনভাবে পরতে হবে যাতে বেরেট বা পিক ক্যাপ পরার পরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান না হয়।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই নতুন ড্রেস কোড শুধু পোশাকের পরিবর্তন নয়, বরং ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে এসে আরও স্বতন্ত্র, আধুনিক এবং ভারতকেন্দ্রিক সামরিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা মহলের একাংশ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর