আরজি কর-কাণ্ডে মৃত তরুণী চিকিৎসক ‘অভয়া’র মৃত্যুর দু’বছর পর ফের তদন্তের পরিধি বাড়ল। পানিহাটি শ্মশানঘাটে তাঁর দেহ সৎকারের সময় কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখতে নতুন করে FIR দায়ের হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশের পর খড়দহ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন অভয়ার বাবা। সেই অভিযোগে পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ (Nirmal Ghosh), পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সোমনাথ দে (Somnath Dey) এবং সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
অভয়ার পরিবারের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৯ অগস্টের ঘটনার পর থেকে গোটা তদন্ত প্রক্রিয়ায় এখনও একাধিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বিশেষ করে সেদিন কী ঘটেছিল এবং কারা কী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা নিয়ে বারবার নতুন করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁর বাবা-মা। সেই আবহেই এবার নজর ঘুরল পানিহাটি শ্মশানঘাটের দিকে।
অভয়ার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পানিহাটিতে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) দেহ সৎকারের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, দেহ দাহের খরচ পরিবারের তরফে দেওয়া হয়নি এবং প্রয়োজনীয় স্বাক্ষরও ছিল না। এই প্রসঙ্গে তিনি নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দে ও সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করেন।
সেই সভার মঞ্চ থেকেই বারাকপুরের পুলিশ কমিশনারকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে মামলা শুরু করার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। দ্রুত পদক্ষেপ করার বার্তাও দেন তিনি। এর পরেই খড়দহ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন অভয়ার বাবা। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ নতুন করে তদন্ত শুরু করতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে।
অভয়ার বাবার অভিযোগ, ঘটনার দিন অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে দেহ সৎকারের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর আরও দাবি, নির্মল ঘোষ-সহ অভিযুক্তরা শ্মশানে দেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের উপর চাপ তৈরি করেছিলেন।
পরিবারের তরফে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তাঁরা বাড়িতে পৌঁছনোর পর অভিযুক্তরা সেখানে যান এবং শেষশ্রদ্ধা জানানোর জন্য পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়নি। তবে এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ। নতুন FIR-এর ভিত্তিতে পুলিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, সৎকারের নথিপত্র এবং সেই দিনের গোটা ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখবে।
নতুন মামলায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট বা লোপাটের চেষ্টা এবং জোর করে কোনও কাজ করানোর মতো অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। ঠিক কোন ধারায় মামলা রুজু হয়েছে এবং তদন্তে কী কী তথ্য পাওয়া যায়, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ (RG Kar Medical College)-এর সেমিনার হল থেকে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয়। প্রথমে কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং সঞ্জয় রায় নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)-এর নির্দেশে তদন্তভার নেয় সিবিআই (CBI)।
সঞ্জয় রায়কে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিয়েছে। তবে তদন্তে আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অভয়ার বাবা-মা বারবার দাবি করেছেন, ঘটনার সঙ্গে আরও অনেকে যুক্ত থাকতে পারেন। তদন্তের গতি ও ভূমিকা নিয়ে তাঁরা একাধিকবার অসন্তোষও প্রকাশ করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে তদন্তের দায়িত্বে পরিবর্তন এনে নতুন আধিকারিককে দিয়ে সিবিআইয়ের তদন্ত এগোনোর খবরও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ঘটনার দিন ঠিক কী হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য দফতরের তরফেও পৃথক তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই তদন্তের রিপোর্ট মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে জমা দেওয়ার কথা।
তার মধ্যেই পানিহাটি শ্মশানঘাটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন FIR দায়ের হওয়ায় আরজি কর-কাণ্ডের তদন্তে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হল। এবার পুলিশের তদন্তে সৎকারের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ, নথিপত্র এবং অভিযোগে নাম থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই নজর থাকবে।



