তাঁর বিরুদ্ধে চলা তদন্তের গোপন তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদের বিষয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে—এই অভিযোগ তুলে এ বার সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) দ্বারস্থ হলেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মান ও সুনামের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি তদন্তের তথ্য বাইরে প্রকাশ আটকাতে শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। কলকাতা হাই কোর্টে দ্রুত শুনানি না মেলায় তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
অভিষেকের আবেদনে মূল অভিযোগ, পুলিশ এবং বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার হাতে থাকা তথ্য নির্দিষ্ট কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁকে কী প্রশ্ন করা হয়েছে, এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত তথ্যও প্রকাশিত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের তথ্য প্রকাশের ফলে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তদন্তের নিরপেক্ষতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
শীর্ষ আদালতের কাছে অভিষেকের আবেদন, তদন্ত সংক্রান্ত কোনও গোপন তথ্য যাতে বাইরে প্রকাশ না হয়, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হোক। পাশাপাশি, তদন্তে প্রভাব পড়তে পারে বা তাঁর সম্মানহানি ঘটতে পারে—এমন তথ্য ও প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে সংবাদমাধ্যমকে বিরত রাখার নির্দেশ দেওয়ার আর্জিও জানিয়েছেন তিনি। আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী সোমবার সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির শুনানি হতে পারে।
এই আইনি পদক্ষেপের আগে কলকাতা হাই কোর্টে একই বিষয়ে আবেদন করেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। প্রথমে বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের বেঞ্চে মামলাটি ওঠে। বিচারপতি জানান, বিষয়টি তাঁর বিচারাধীন বেঞ্চের এক্তিয়ারভুক্ত নয়। উপযুক্ত বেঞ্চে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় অভিষেকের আইনজীবীকে।
এর পর মামলাটি বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে পৌঁছয়। সেখানে অভিষেকের আইনজীবী দ্রুত শুনানির আর্জি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, মামলাটি ডিসেম্বর মাসে শুনানির জন্য রাখা হয়েছে, অথচ তদন্ত সংক্রান্ত নানা তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অপেক্ষা করা কঠিন, তাই প্রয়োজনে মামলাটি অবকাশকালীন বেঞ্চে পাঠানোর আবেদনও করা হয়।
কিন্তু দ্রুত শুনানির সেই আর্জিতে সাড়া দেয়নি হাই কোর্ট। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য জানান, অবকাশকালীন বেঞ্চে সব মামলা পাঠানো যায় না। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, অবকাশকালীন বেঞ্চ কোনও ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ নয়। ফলে জরুরি ভিত্তিতে শুনানি না হওয়ায় এ বার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিষেক।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর একাধিক অভিযোগের তদন্তে অভিষেককে বিভিন্ন সময়ে তলব করেছে পুলিশ-সহ একাধিক তদন্তকারী সংস্থা। কখনও ভবানী ভবনে, কখনও সংশ্লিষ্ট থানায় হাজিরা দিতে হয়েছে তাঁকে। অভিষেকের অভিযোগ, তদন্তের স্বার্থে হওয়া জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়গুলি গোপন থাকার কথা থাকলেও সেগুলি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁকে কী প্রশ্ন করা হয়েছিল, সেই তথ্যও বাইরে এসেছে বলে দাবি তাঁর।
এর আগে হাই কোর্টে অভিষেকের আইনজীবী দাবি করেছিলেন, তাঁর মক্কেলকে ঘিরে কিছু প্রতিবেদনে অনুমাননির্ভর ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। বিদেশযাত্রা, ব্যক্তিগত জীবন এবং বৈবাহিক জীবন নিয়ে প্রকাশিত কিছু খবরের সঙ্গে চলতি তদন্তের সরাসরি সম্পর্ক নেই বলেও আদালতে সওয়াল করা হয়েছিল। অভিষেকের বক্তব্য, এ ধরনের প্রকাশনা তাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে।
এখন সুপ্রিম কোর্টে এই আবেদনের শুনানির দিকেই নজর রয়েছে। তদন্তের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার দাবি এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে তথ্য প্রকাশের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কী ভাবে বজায় থাকবে, সেই প্রশ্নও এই মামলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তবে শীর্ষ আদালত এখনও এই বিষয়ে কোনও নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা যায়নি; অভিষেকের আবেদন এবং তাঁর অভিযোগের বিচার হওয়া বাকি।



