কার্তিক মাসের সন্ধ্যা। চারদিকে অন্ধকার নামতেই বাড়ির ছাদে, উঠোনে কিংবা তুলসীতলায় জ্বলে ওঠে একটি ছোট্ট আলো। উৎসবের ঝলমলে আলোর মতো নয়, বরং নিঃশব্দে জ্বলে থাকা সেই প্রদীপের নাম আকাশপ্রদীপ। বাংলার বহু বাড়িতে আজও এই রীতি পালন করা হয়। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আলো নিবেদন করা হয় ভগবান বিষ্ণু এবং প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে। বিশ্বাস, আকাশের দিকে তুলে ধরা সেই আলো পূর্বপুরুষদের মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে ফিরে যাওয়ার পথ চিনিয়ে দেয়।
আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর রীতি মূলত কার্তিক মাসকে কেন্দ্র করে। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি থেকে কার্তিক মাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই প্রদীপ জ্বালানো হয়। বাড়ির ছাদে উঁচু বাঁশের খুঁটি বসিয়ে তার মাথায় প্রদীপ রাখা হত। কোথাও আবার উঠোনে কিংবা তুলসীমঞ্চের কাছেও আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর চল রয়েছে।
এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার বিশ্বাস। হিন্দু ধর্মীয় ধারণা অনুযায়ী, মহালয়ার দিন তর্পণের মাধ্যমে প্রয়াত পিতৃপুরুষদের স্মরণ করা হয়। এরপর কার্তিক মাস জুড়ে তাঁদের স্মৃতিতে প্রদীপ জ্বালানোর রীতি প্রচলিত রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, দীপান্বিতা অমাবস্যার সময় তাঁদের মর্ত্যলোক থেকে বিদায়ের মুহূর্তে এই আলো পথ দেখায়। সেই কারণেই আকাশপ্রদীপকে অনেকেই পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে নিবেদিত আলোর প্রতীক হিসেবে দেখেন।
তবে আকাশপ্রদীপের তাৎপর্য শুধু পূর্বপুরুষদের স্মরণেই সীমাবদ্ধ নয়। কার্তিক মাসে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনার সঙ্গেও এই রীতির যোগ রয়েছে। পুরাণের বিশ্বাস অনুযায়ী, চার মাসের যোগনিদ্রা শেষে কার্তিক মাসে জাগ্রত হন বিষ্ণু। তাঁকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে এই মাসে সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন ভক্তেরা। বিশেষত দামোদর রূপে বিষ্ণুর উদ্দেশে আকাশপ্রদীপ নিবেদনের প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রদীপ জ্বালানোর সময় নির্দিষ্ট মন্ত্র উচ্চারণের রীতিও রয়েছে। এই মন্ত্রে বিষ্ণু, ধর্মরাজ, প্রজাপতি এবং পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে প্রদীপ নিবেদনের কথা বলা হয়। অর্থাৎ, আকাশপ্রদীপের আলো একদিকে যেমন দেবতার আরাধনার অংশ, অন্যদিকে তেমনই পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মরণ জানানোর প্রতীক।
আগেকার দিনে আকাশপ্রদীপ জ্বালাতে মাটির প্রদীপে ঘি, তিলের তেল কিংবা কর্পূর ব্যবহার করা হত। বাঁশের খুঁটির মাথায় প্রদীপ রাখার জন্য বিশেষ কাঠামো তৈরি করা হত। প্রদীপের চারপাশে থাকত ঘেরাটোপ, যাতে বাতাসে শিখা সহজে নিভে না যায়। খোলা আকাশের নীচে উঁচুতে জ্বলতে থাকা সেই আলো দূর থেকেও চোখে পড়ত।
প্রদীপের সঙ্গে মানবজীবনের প্রতীকী সম্পর্কও ব্যাখ্যা করা হয় ধর্মীয় পরম্পরায়। বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের শরীর পঞ্চভূত—ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম—দিয়ে গঠিত। মাটির প্রদীপও এই উপাদানগুলির প্রতীকী উপস্থিতি বহন করে। তাই নশ্বর শরীরের প্রতীক হিসেবে প্রদীপকে জীবনদেবতার উদ্দেশে নিবেদনের ব্যাখ্যাও প্রচলিত রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর ধরন। একসময় মাটির প্রদীপ ও বাঁশের কাঠামো ছিল এই রীতির প্রধান উপকরণ। এখন অনেক বাড়িতে তার জায়গা নিয়েছে ছোট বাল্ব, টুনি লাইট কিংবা বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা। শহরের বহুতলে ছাদে বা বারান্দায় আলো জ্বালানোর চল দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলে এখনও কোথাও কোথাও বাঁশের খুঁটিতে সাবেকি প্রদীপ জ্বালানোর রীতি বজায় রয়েছে। যাঁদের বাড়িতে ছাদ নেই, তাঁরা উঠোনের তুলসীমঞ্চেও প্রদীপ জ্বালান।
আকাশপ্রদীপের এই প্রথা তাই কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বাংলার পারিবারিক স্মৃতি ও লোকসংস্কৃতিরও অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতিতে মিশে রয়েছে দেবতার আরাধনা, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মরণ। কার্তিকের দীর্ঘ সন্ধ্যায় আকাশের দিকে তুলে রাখা ছোট্ট প্রদীপটি যেন সেই স্মৃতিরই নীরব বাহক।



