লক্ষ্মীপুজোয় ঘরের দরজায় আঁকা হয় পায়ের ছাপ, কেন? চালের গুঁড়ির আলপনা আর ধানের শিষের নেপথ্যের কাহিনি

লক্ষ্মীপুজোয় দরজায় দেবীর পায়ের ছাপ, আলপনায় ধানের শিষ, পদ্ম ও পেঁচার নকশা—চালের গুঁড়ির এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ধর্মীয় বিশ্বাস ও কৃষিজীবন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

লক্ষ্মীপুজোর আগে বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয় আলপনা দেওয়ার প্রস্তুতি। চালের গুঁড়ি আর জলে তৈরি সাদা রঙে মেঝেতে আঁকা হয় পদ্ম, শঙ্খ, ধানের শিষ, পেঁচা এবং ছোট ছোট পায়ের ছাপ। বাড়ির প্রবেশদ্বার থেকে পুজোর স্থান পর্যন্ত কখনও সারি দিয়ে আঁকা হয় সেই পায়ের ছাপ। প্রচলিত বিশ্বাস, এই পদচিহ্ন ধরেই দেবী লক্ষ্মী ঘরে প্রবেশ করেন। কিন্তু এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বাংলার কৃষিজীবন, লোকশিল্প এবং গৃহস্থালির সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষাও।

বাংলার আলপনা তাই নিছক মেঝে সাজানোর শিল্প নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই লোকশিল্পে ফুটে ওঠে মানুষের বিশ্বাস, কামনা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রতীক। লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় তার সবচেয়ে পরিচিত প্রকাশ দেখা যায় দেবীর পায়ের ছাপ ও ধানের শিষের নকশায়।

লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকার রীতি কেন?

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় বাড়ির দরজায় ছোট ছোট পায়ের ছাপ আঁকার রীতি বাংলার পরিচিত লোকাচারগুলির মধ্যে অন্যতম। অনেক পরিবারে এই ছাপগুলি এমনভাবে আঁকা হয়, যেন কেউ বাইরে থেকে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করছেন। কোথাও প্রবেশদ্বার থেকে ঠাকুরঘর পর্যন্ত, কোথাও আবার বাড়ির বিভিন্ন ঘর ও সিঁড়িতে এই পদচিহ্ন দেখা যায়।

প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী ঘরে ঘরে আসেন এবং তাঁর আশীর্বাদে সংসারে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে। সেই বিশ্বাস থেকেই আলপনায় দেবীর পদচিহ্ন এঁকে তাঁকে বাড়িতে আহ্বান জানানোর রীতি গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়। এটি লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় আচারের অংশ; দেবীর আগমনের কোনও যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে একে দেখা হয় না।

পায়ের ছাপের নকশায় সাধারণত জোড়া ছোট পায়ের চিহ্ন থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তার মাঝখানে ঢেউখেলানো রেখা আঁকা হয়, যা ধানের শিষের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই নকশা শুধু দেবীর আগমনকে বোঝায় না, শস্য ও সমৃদ্ধির কামনাকেও প্রকাশ করে।

চালের গুঁড়ির আলপনা: বাংলার ঘরোয়া লোকশিল্প

বাংলার ঐতিহ্যবাহী আলপনা সাধারণত চালের গুঁড়ি ও জল মিশিয়ে তৈরি সাদা গোলা দিয়ে আঁকা হয়। কোথাও আঙুল দিয়ে, কোথাও কাপড়ের ছোট টুকরো ব্যবহার করে মেঝেতে নকশা তোলা হয়। প্রথাগত আলপনায় সাদা রঙের ব্যবহার বিশেষভাবে পরিচিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জায়গায় রঙিন আলপনাও জনপ্রিয় হয়েছে।

আলপনার নকশা নির্দিষ্ট কোনও এক ছাঁচে বাঁধা নয়। পদ্ম, লতা-পাতা, শঙ্খ, পাখি, ধানের শিষ, পায়ের ছাপ এবং জ্যামিতিক নকশা—বিভিন্ন উপলক্ষ অনুযায়ী নানা মোটিফ ব্যবহার করা হয়। লক্ষ্মীপুজোয় দেবীর পায়ের ছাপ, পেঁচা এবং ধানের শিষের মতো নকশা বিশেষভাবে পরিচিত।

বাংলার লোকশিল্প নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা ও সাংস্কৃতিক নথিতে আলপনাকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ব্রত এবং সামাজিক উৎসবের সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহ্যবাহী মেঝেচিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই শিল্পের নকশায় স্থানীয় জীবনযাত্রা ও আঞ্চলিক বিশ্বাসের ছাপও পাওয়া যায়।

ধানের শিষের নকশায় কেন এত গুরুত্ব?

বাংলার লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় ধানের শিষের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে কৃষি ও ধানচাষ বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি এবং গৃহস্থালির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধান মানে শুধু খাদ্য নয়, পরিবারের সারা বছরের সঞ্চয় ও জীবিকার সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে।

এই কারণেই লক্ষ্মীর আরাধনায় ধান ও শস্যের প্রতীকী ব্যবহার দেখা যায়। আলপনায় ধানের শিষ আঁকার মধ্য দিয়ে ভালো ফসল, খাদ্যসংস্থান এবং সংসারের সমৃদ্ধির কামনা প্রকাশ পায় বলে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন আলোচনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বাংলার কিছু লোকাচারে লক্ষ্মীকে শস্য ও ফসলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেও দেখা হয়।

ধানের শিষের পাশাপাশি কোথাও ধানের গোলা, মাপার পাত্র, কৃষিকাজের সরঞ্জাম কিংবা শস্যভরা পাত্রের মোটিফও ব্যবহৃত হয়। এই সব নকশা থেকে বোঝা যায়, আলপনা শুধু দেবদেবীর ছবি আঁকার মাধ্যম নয়; কৃষিনির্ভর সমাজে মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার কথাও এতে ফুটে ওঠে।

আলপনায় পেঁচা, পদ্ম ও শঙ্খের জায়গা কোথায়?

লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় দেবীর পায়ের ছাপের পাশাপাশি পেঁচা, পদ্ম এবং শঙ্খের নকশাও দেখা যায়। হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় পেঁচাকে লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে মানা হয়। তাই দেবীর প্রতিমা ও আলপনা—দুই ক্ষেত্রেই পেঁচার উপস্থিতি পরিচিত।

পদ্ম দেবীর সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। শঙ্খও হিন্দু ধর্মীয় আচারে বহুল ব্যবহৃত। তবে প্রতিটি মোটিফের ব্যাখ্যা অঞ্চল ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী বদলাতে পারে। আলপনার নকশা শিল্পীর নিজস্ব শৈলী এবং পরিবারের প্রচলিত আচারের উপরও নির্ভর করে।

শুধু লক্ষ্মীপুজো নয়, বাংলার নানা উৎসবেই আলপনা

আলপনার ব্যবহার লক্ষ্মীপুজোয় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার বিভিন্ন ব্রত, বিয়ে এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে মেঝেতে নকশা আঁকার রীতি রয়েছে। উৎসব বা অনুষ্ঠানের সঙ্গে মিল রেখে নকশা বদলে যায়। কোথাও পদ্ম ও লতাপাতা, কোথাও শঙ্খ, কোথাও আবার কৃষিজীবনের সঙ্গে যুক্ত নানা প্রতীক ব্যবহার করা হয়।

বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলেও চালের গুঁড়ি বা অনুরূপ উপকরণ দিয়ে মেঝেতে নকশা আঁকার রীতি রয়েছে। তবে অঞ্চলভেদে এর নাম, নকশা ও ব্যবহার আলাদা। বাংলার আলপনার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হল তার সাদা রঙের প্রথাগত নকশা, হাতে আঁকার পদ্ধতি এবং ব্রত ও গৃহস্থালির আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে রয়েছে আলপনার ঐতিহ্য

একসময় বাড়ির মহিলারা নিজের হাতে আলপনা আঁকার প্রস্তুতি নিতেন। চালের গুঁড়ি ভিজিয়ে গোলা তৈরি করা থেকে শুরু করে দরজার সামনে পায়ের ছাপ, পুজোর জায়গায় পদ্ম কিংবা ধানের শিষের নকশা—সবই ছিল পারিবারিক প্রস্তুতির অংশ। এখনও বহু বাড়িতে সেই রীতি বজায় রয়েছে। কোথাও পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা ছোটদের আলপনা আঁকা শেখান, কোথাও আবার শিল্পীরা নতুন নকশার সঙ্গে পুরনো মোটিফের মেলবন্ধন ঘটান।

আলপনার প্রতিটি রেখার নির্দিষ্ট ধর্মীয় অর্থ রয়েছে, এমন দাবি করা যায় না। কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর পায়ের ছাপ, ধানের শিষ এবং অন্যান্য শুভ প্রতীকের মধ্যে যে সমৃদ্ধি, শস্য ও মঙ্গলের কামনা প্রকাশ পায়, তা বাংলার লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

দরজার সামনে আঁকা সেই ছোট্ট পায়ের ছাপ তাই অনেক পরিবারের কাছে শুধুই একটি নকশা নয়। এটি লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতি, পারিবারিক স্মৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বাংলার ঘরোয়া শিল্পসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পরিচিত ঐতিহ্য।

লক্ষ্মীপুজো স্পেশাল:
১. কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ২০২৬ কবে ও কখন? জেনে নিন পূর্ণিমার তিথি, শুভ সময় ও পুজোর সম্পূর্ণ পদ্ধতি
২. কোজাগরী পূর্ণিমা কেন বিশেষ? ‘কো জাগর্তি’ কথার অর্থ ও ধর্মীয় তাৎপর্য
৩. লক্ষ্মীপুজোয় কী ভোগ দেবেন? খই-মুড়ি থেকে নাড়ু-পায়েস—রইল তালিকা ও সহজ রেসিপি
৪. লক্ষ্মীর পাঁচালি: কেন পাঠ করা হয়? জানুন পুজোর নিয়ম ও প্রচলিত কাহিনি
৫. দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন? ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও প্রতীকী অর্থ জানুন
৬. বাংলার লক্ষ্মীপুজোর ঐতিহ্য: কোথাও সরা, কোথাও প্রতিমা—জানুন নানা রীতি

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর