পুজোর আবহে ফের কলকাতায় বাংলাদেশের সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। চলতি বছরে দ্বিতীয়বার কলকাতায় এসে বৃহস্পতিবার মহাজাতি সদনে ‘শিকল ভাঙার গল্প’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। সাহিত্য, কবিতা, গান ও নাচের এই অনুষ্ঠানে তসলিমার উপস্থিতি ঘিরে ছিল বাড়তি আগ্রহ। কলকাতায় ফিরে নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার নিয়েও মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ‘শুভেন্দু সরকার ভাল কাজ করছে।’
তসলিমার এই কলকাতা সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ দিকে বা অগস্টের শুরুতে প্রথমবার কলকাতায় ফিরেছিলেন তিনি। এবার ফের শহরে এসে একাধিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। আগামী দিনে কলকাতায় আরও বেশি সময় কাটানোর ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন লেখিকা।
কলকাতায় ফের এসে কেমন লাগছে, সেই প্রশ্নের উত্তরে তসলিমা জানান, প্রথমবার ফিরে আসার অনুভূতি ছিল অন্যরকম। এবার অনেকটাই স্বাভাবিক লাগছে। যতবার কলকাতায় আসবেন, ততই শহরটিকে নিজের বলে মনে হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বইমেলায় আসার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। শুধু সাহিত্যিক অনুষ্ঠানের জন্য নয়, সুযোগ পেলে ঘুরতে কলকাতায় আসার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তসলিমা। এবারের সফরে কয়েক দিন শহরে থাকবেন তিনি। মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন।
কলকাতার সঙ্গে তাঁর পুরনো সম্পর্কের প্রসঙ্গও উঠে আসে কথোপকথনে। ব্রহ্মপুত্রের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তসলিমা নদীর নামের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, পদ্মা, সুরমা, গঙ্গা, যমুনার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগই বা কম কী!
বাংলাদেশ থেকে তাঁর নির্বাসন এবং দীর্ঘদিন কলকাতায় না ফিরতে পারার প্রসঙ্গেও কথা বলেন তসলিমা। তাঁর বক্তব্য, এক সরকার তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, পরের একটি সরকার তাঁকে বাংলাদেশে ফিরতে দেয়নি। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্য একটি সরকার তাঁকে কলকাতায় আসার সুযোগ দিয়েছে— এই তিন পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলেই মনে করেন তিনি।
তসলিমার দাবি, এখনও তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব রয়েছে। কখনও কখনও তাঁকে ঘিরে ঘৃণা এবং আক্রমণের আশঙ্কার কথাও অনুভব করেন বলে জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা তাঁকে ভালোবাসেন এবং সমর্থন করেন বলেও মন্তব্য করেছেন লেখিকা।
ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে এক করে দেখা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তসলিমা। তাঁর দাবি, ভারতে বসে তিনি নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন। বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি বলেই মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদী ও জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তসলিমা। তাঁর বক্তব্য, সরকারকে এই ধরনের শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং দুর্গাপুজোয় প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনাগুলি নিয়েও তিনি উদ্বেগ জানিয়েছেন।
শুভেন্দু সরকার নিয়ে কী বললেন?
কলকাতায় ফিরে আসার সুযোগ এবং তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তসলিমা। সেই প্রসঙ্গেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের কাজ নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন তিনি।
তসলিমার বক্তব্য অনুযায়ী, শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে কলকাতায় আসার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হবে না এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকার নেবে বলে জানিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কথা হয়নি বলেও জানিয়েছেন লেখিকা। তবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।
তসলিমার কথায়, কোনও একদিন যদি তাঁকে কলকাতায় স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তিনি অত্যন্ত খুশি হবেন। তাঁর বক্তব্যে কলকাতার প্রতি দীর্ঘদিনের টানও স্পষ্ট হয়েছে।
বর্তমানে অবশ্য তিনি দিল্লিতে থাকেন এবং কলকাতায় এসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলিতে যোগ দিচ্ছেন। চলতি সফরে মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠান ছাড়াও আরও কয়েকটি কর্মসূচিতে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। আগামী বছর থেকে কলকাতার দুর্গাপুজোয় থাকার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
নিজের মৃত্যুর পর দেহদানের সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন তসলিমা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নিজের দেহ চিকিৎসা গবেষণার কাজে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমানে যে দেশে তাঁর মৃত্যু হবে, সেখানকার সংশ্লিষ্ট হাসপাতালেই দেহদান করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
অন্যদিকে, কলকাতায় আরও বেশি সময় কাটানোর ইচ্ছা যে তাঁর রয়েছে, তা এদিনের বক্তব্যেও স্পষ্ট করেছেন তসলিমা। বইমেলা থেকে দুর্গাপুজো— শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ নির্বাসনের পর কলকাতায় ফেরার সুযোগ পাওয়া তসলিমার কাছে তাই শুধু একটি সফর নয়, পুরনো শহরের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলারও একটি পর্ব। আর সেই সফরের মাঝেই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার নিয়ে তাঁর ইতিবাচক মন্তব্য রাজনৈতিক মহলেও আলাদা করে নজর কেড়েছে।



